বিশ্বকাপের শুরুটা এরচেয়ে ভালো হতে পারতো না

মেলবোর্ন, ১৭ই ফেব্রুয়ারি

ছবির কপিরাইট REUTERS

বিশ্বকাপ ক্রিকেট ২০১৫-র মাত্র তিন দিন পার হলো, আজ চতুর্থ দিন।

কিন্তু 'মর্নিং শোজ দ্য ডে' এই কথা মানলে বলতে হবে, অন্তত দর্শকসংখ্যার বিচারে এই বিশ্বকাপ কতটা সফল হতে যাচ্ছে - তা নিয়ে বোধ হয় এখন আর কারো মনে কোন সন্দেহ নেই।

বিশ্বকাপের দিক থেকে দেখলে শুরুটা বোধ হয় এর থেকে ভালো আর কিছুই হতে পারতো না।

১৪ই ফেব্রুয়ারি অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডএর খেলায় ৯০ হাজার দর্শক, নিউজিল্যান্ড-শ্রীলঙ্কায় ম্যাচে প্রায় ২৫ হাজার এবং ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে ৪২০০০ দর্শক – টুর্নামেন্টের প্রথম তিন দিনেই এই আগ্রহ উন্মাদনা অভাবনীয়।

ভারত-পাকিস্তান ম্যাচটি ম্যাচ টিভিতে যে পরিমাণ লোকে দেখেছে - তার সংখ্যা ছিল ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

এর জন্য আয়োজকদের সাধুবাদ দিতেই হবে। তারা বুদ্ধি করে প্রথমেই ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া এবং ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ রাখাতে, বিশ্বকাপের শুরুটাই হয়ে গেল স্বপ্নের। ৫০-ওভার ক্রিকেটের ভবিষ্যতের জন্য এই চিত্রটি বোধ হয় দরকার ছিল।

গত বছরগুলোতে খুব আলোচনা হচ্ছিল যে ৫০ ওভারের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ কতটা নিশ্চিত। টেস্ট ক্রিকেট এবং টি২০ ক্রিকেটের মাঝে ৫০-ওভারের ক্রিকেটের মৃত্যু হয় কীনা?

কিন্তু এই বিশ্বকাপের প্রথম তিনদিন দেখে আমি কিন্তু সেসব প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই পেয়ে গেছি।

বাণিজ্যিক দিকের বিচারেও এই বিশ্বকাপের শুরুটা এর চেয়ে ভালো হয়তো হতে পারতো না। টিভিতে ক্রিকেট দর্শক সংখ্যার দিক দিয়ে, রোববারের ভারত-পাকিস্তানের ম্যাচ সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

এই পরিসংখ্যান আইসিসিকে একদিনের ক্রিকেট নিয়ে অনেকটাই উৎসাহিত করবে।

অ্যাডেলেইডে রোববার ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ কতটা দর্শনীয় ছিল তা নিয়ে হয়তো বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু ভক্তদের আবেগ-উচ্ছাসের সেই চিত্র আজীবন মনে রাখার মতো।

অ্যডেলেইড খুব বড় শহর নয়। সেখানে জড়ো হয়েছিলো চল্লিশ হাজারেরও বেশি ভারতীয় এবং পাকিস্তানী ফ্যান। আমার দু'দশকের ক্রিকেট কাভার করার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, বিদেশের মাটিতে নিজেদের দেশের দলকে নিয়ে এই উন্মাদনা আমি আগে কখনো দেখিনি।

আ্যাডেলেইড শহরের কেন্দ্রে রাত বারোটায় সারি বেঁধে ভারতীয়রা 'হাম হোঙ্গে কামিয়াব' গাইছেন, এক অন্যকে আলিঙ্গন করছেন—বিদেশের মাটিতে এই দৃশ্য আমি অন্তত দেখি নি।

তবে মনে রাখতে হবে বিশ্বকাপ সবে শুরু হয়েছে। এই উৎসাহ ধরে রাখাটাই আসল চ্যালেঞ্জ।

ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া বা ভারত-পাকিস্তানের মতো হাই প্রোফাইল ম্যাচ হাতে গোনা ক'টি। বাকি ম্যাচগুলোতে মাঠে দর্শক না এল ৫০-ওভার ক্রিকেট নিয়ে সন্দেহ অব্যাহত থাকবে।

তবে প্রথম তিন দিন বিশ্বকাপ সেই সন্দেহ দূরে রাখতে পেরেছে।

অ্যাডেলেইড, ১৪ই ফেব্রুয়ারি

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption ভারত ও পাকিস্তানের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনার পারদ এখন তুঙ্গে

ভারত পাকিস্তান খেলা শুরু হতে আর বেশি দেরি নেই । খেলা নিয়ে একদিকে যেমন উত্তেজনার পারদ চড়ছে এবং সমর্থকদের মধ্যে একধরনের অদ্ভুত উন্মাদনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, অন্যদিকে দুই দলের খেলোয়াড়দের কিন্তু অনেকধরনের চাপ সামলাতে হচ্ছে- যার মধ্যে রয়েছে অনেক কিছু না করতে পারার চাপ।

প্রথমে ভারতীয় দলের দিকে তাকানো যাক্‌। ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট সমস্ত প্লেয়ারকে পরিস্কার জানিয়ে দিচ্ছে তারা কী কী করতে পারবেন না।

প্লেয়ারদের টুইটার ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আছে – বা বলা যেতে পারে যে তারা যেন অত্যন্ত বিবেচনা করে টুইট করেন- এমনটাই বলা হচ্ছে।

ফেসবুকে নতুন বন্ধু করতে পারার ওপরেও নিষেধাজ্ঞা আছে। আবার নতুন কোনো স্পনসরশিপ চুক্তি খেলোয়াড়রা বিশ্বকাপ চলাকালীন করতে পারবেন না- কোনো এজেন্ট বা স্পনসরের সাথে কথাও বলতেপারবেন না।

ম্যাচ ফিক্সিং-এর ভূত এখন ক্রিকেটে এমনভাবে জাঁকিয়ে বসেছে যে বিশ্বকাপও তার বাইরে নয়। এবং ভারতীয় ক্রিকেটারদের এমনও বলা হচ্ছে যে তারা কোনো ব্যক্তিকে – সে যতই পরিচিত হোন্‌ না কেন- ঘরে ডাকতে পারবেন না- তাদের সাথে কথাও বলতে পারবেন না।

যেটা সবচেয়ে অদ্ভুত সেটা হল ভারতীয় মিডিয়া ম্যানেজার ভারতীয় সাংবাদিকদের পর্যন্ত বলছেন যে তারা প্লেয়ারদের ‘হ্যালো’ পর্যন্ত বলতে পারবেন না। বললে তা নাকি নিয়ম-বহির্ভূত কাজ হবে।

এমন ঘটনা আগে কোনোদিন কোনো বিশ্বকাপে হয়েছে কীনা সন্দেহ।

পাকিস্তানের আবার অন্য সমস্যা।

টিমে ডিসিপ্লিন আনার চেষ্টায় পাকিস্তান টিম ম্যানেজমেন্ট আটজন প্লেয়ারকে ৩০০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার করে জরিমানা করতে বাধ্য হয়েছেন রাতের খাওয়া খেয়ে ৪৫ মিনিট দেরি করে ফেরার জন্য। বলা হয়েছে তারা নাকি কারফিউ ভেঙেছেন এবং সেই কারণে তাদের এমনও বলা হচ্ছে যে যদি আরেকবার তারা এমন করেন তাদের তৎক্ষণাৎ পাকিস্তান ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

এই আটজনের মধ্যে সিনিয়ার প্লেয়াররাও রয়েছেন। শাহিদ আফ্রিদি, উমর আকমল, আহমেদ শেহ্‌জাদ- এরা প্রত্যেকেই এই ৩০০ ডলার জরিমানা দিতে বাধ্য হয়েছে সিডনিতে টিম কারফিউ ভাঙার কারণে।

প্রশ্ন করা যেতেই পারে এইধরনের ডিসিপ্লিন কি বিশ্বকাপের মত টুর্নামেন্টে খেলোয়াড়দের পক্ষে ভাল নাকি এগুলো এক একটা বজ্রআঁটুনির মত যা কীনা খেলোয়াড়দের আরো বেশি করে চাপের সম্মুখীন করে তোলে? গ্যারি কার্সটিনের সাথে কথা বলে মনে হল সাউথ আফ্রিকা টিমে কিন্তু এসব কিছুই নেই।

কার্সটিন যা বল্লেন তার সারমর্ম হল “প্লেয়াররা কেউই ছেলেমানুষ নন। তাই এসব করে কোনো লাভ হয় বলে তো মনে হয় না। দেশের জন্য খেলাটা সবচেয়ে বড় ইন্সপিরেশন- অনুপ্রেরণা। বরং এইসব ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশনের উল্টো ফল হতে পারে।“

এখন দেখার ভারত এবং পাকিস্তান এই সমস্ত চাপ সামলে রবিবার তাদের সেরা খেলাটা দর্শকদের উপহার দিতে পারে কীনা!

অ্যাডেলেইড, ১২ই ফেব্রুয়ারি

ছবির কপিরাইট bbc
Image caption জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান

এই লেখা যখন পাঠকরা পড়া শুরু করেছেন, বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সদ্য শেষ হয়েছে। নব্বই হাজার দর্শক ভর্তি মেলবোর্নের মাঠে অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড ম্যাচের আর ঠিক ২৪ ঘণ্টা বাকি।

অ্যাডেলেইডে নেমেই বুঝতে কষ্ট হয়নি বড় কোনো উৎসবের জন্য প্রস্তুত অস্ট্রেলিয়া।

টেরেন্স নদী পেরিয়ে অ্যাডেলেইড ওভালের কাছে যেতেই উৎসবের আমেজটা টের পেলাম।

তৈরি হয়েছে ফ্যান জোন। এমনকি সেই সাথে লাউড স্পিকারে 'শিলা কি জওয়ানি' বা 'চাক দে ইন্ডিয়া' ধরণের বলিউডের গানের সুর। কারণ দুদিন বাদেই এই ওভালেই মুখোমুখি হচ্ছে ভারত ও পাকিস্তান।

এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের টিকিট বিক্রি হয়েছে আট লাখেরও বেশি। এর মধ্যে বহু টিকেট কিনেছেন পৃথিবীর নানা প্রান্তের ক্রিকেট অনুরাগীরা।

বিশ্বকাপ শুরুর আগে ফ্যানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্ন হলো– কে জিতবে ক্রিকেটের শ্রেষ্ঠ এই সম্মান? কোনো অঘটন কি ঘটবে? নায়ক হয়ে দেখা দেবেন কে? কে হবেন ট্র্যাজিক নায়ক?

নিঃসন্দেহে বলা যায় সবচেয়ে ওপেন একটি বিশ্বকাপ হচ্ছে এটি। খেতাব জেতার সম্ভাবনা অন্তত ছয়টা দেশের।

সে কারণে হয়ত অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক আমাকে বললেন, "অস্ট্রেলিয়া দলে গভীরতা আছে ঠিকই, কিন্তু সতর্ক থাকতে হবে, আমরা যেন ঠিক সময়ে শ্রেষ্ঠ খেলাটা খেলতে পারি"।

বিশ্বকাপ একটা লম্বা টুর্নামেন্ট। সঠিক সময়ে নিজের সেরা খেলাটা অবশ্যই জরুরি। তাই এখনই কি ফেভারিট বেছে নেওয়া সম্ভব?

২০১১ সালে যেমন উপমহাদেশের দলগুলোর রমরমা ছিল, এবারে কী অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি?

যতজন বিশেষজ্ঞের সাথে গত ক'দিনে আমার কথা হয়েছে, প্রত্যেকেই একমত যে এই তিনটি দলই সেমিফাইনালে ওঠার দাবিদার।

বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড ঘরের মাঠে খেলার সুবিধা তো পাবেই, এছাড়া দুটো দলের মধ্যে গভীরতা অনেক।

অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য এবারের বিশ্বকাপ শ্রেষ্ঠ সুযোগ। দলের দুই প্রধান স্তম্ভ - এবি ডিভিলিয়ার্স এবং হাশিম আমলা- এ মুহূর্তে তাদের ব্যাটিং ফর্মের তুঙ্গে। তাছাড়া, মরনি মরকল এবং ডেল স্টেন অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডের উইকেটের জন্য আদর্শ দুই বোলার।

কোন দল জিতবে তা নিয়ে যেমন আলোচনা, তেমনি কোন ক্রিকেটার তার সেরাটা বিশ্বকাপের মঞ্চে তুলে ধরবেন তা নিয়েও অনেক জল্পনা চলছে।

মাইকেল ক্লার্ককে জিজ্ঞেস করেছিলাম। অনেকক্ষণ ধরে ভেবে তিনটি নাম বললেন - মিচেল জনসন, ডিভিলিয়ার্স এবং ভিরাট কোহলি।

চিঠিপত্র: সম্পাদকের উত্তর