উপকূল কর্মকর্তার স্বীকারোক্তি নিয়ে অস্বস্তিতে দিল্লী

ছবির কপিরাইট AVMS

মাসদেড়েক আগে আরব সাগরে পাকিস্তানি একটি নৌকাকে ভারতই উড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল – উপকূলরক্ষী বাহিনীর এক শীর্ষ কর্মকর্তার এই স্বীকারোক্তি দিল্লিকে চরম অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে।

ভারত এর আগে দাবি করেছিল, ওই নৌকাটিকে ধাওয়া করা হলে নৌকার যাত্রীরা নিজেরাই সেটিকে উড়িয়ে দেয়। ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিক্কর অবশ্য এখনও সেই অবস্থান থেকে সরে আসেননি, তবে আজ তিনি ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

বিরোধী কংগ্রেস ইতিমধ্যে দাবি তুলেছে, সেদিন আসলে ঠিক কী ঘটেছিল সরকারকে তা পরিষ্কার করতে হবে।

কোস্ট গার্ড কর্মকর্তার ভিডিও ফুটেজ

নিউ ইয়ার্স ইভের রাতে ভারতের গুজরাট উপকূল থেকে বেশ কিছুটা দূরে গভীর সমুদ্রে একটি পাকিস্তানি নৌকা দাউদাউ করে জ্বলছে – এ ছবি প্রকাশ করেছিল ভারতের কোস্ট গার্ড বা উপকূলরক্ষী বাহিনীই। তবে কীভাবে ওই নৌকাটিতে বিস্ফোরণ ঘটল, তাতে সন্ত্রাসবাদীরা ছিল না কি সাধারণ চোরাকারবারিরা – তা নিয়ে রহস্য ছিল আগাগোড়াই।

ছবির কপিরাইট

কিন্তু সম্প্রতি কোস্ট গার্ডের একটি নিজস্ব অনুষ্ঠানে ওই বাহিনীর ডিআইজি বি কে লোশালি দাবি করেন, তাঁর নির্দেশেই না কি নৌকাটি উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে – যে ভাষণের ভিডিও ফুটেজ ভারতে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার হাতে এসেছে।

ওই ভিডিওতে মি লোশালিকে বলতে শোনাতে যাচ্ছে, ৩১শে ডিসেম্বর রাতের ঘটনা আপনাদের মনে আছে নিশ্চয় – আমরা সেদিন পাকিস্তানকে উড়িয়ে দিয়েছিলাম। আমি সেদিন গান্ধীনগরে ছিলাম, রাতে খবর পেয়েই বললাম, নৌকাটা উড়িয়ে দাও – আমরা তো আর ওদের বিরিয়ানি খাওয়াতে চাই না!

এই দাবি সঠিক হলে সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে তা কিন্তু আদৌ মিলছে না। কারণ ঘটনার পর পরই ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দীর্ঘ বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছিল – গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মধ্যরাতের অভিযানে ওই সন্দেহজনক নৌকাটিকে যখন তাড়া করা হয়, নৌকার আরোহীরা নিজেরাই সেটিতে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সেটিকে শেষ করে দেয়।

সরকারের ড্যামেজ কন্ট্রোলের চেষ্টা

ফলে এদিন ডিআইজি লোশালির ভিডিও ফাঁস হওয়ার পরেই শুরু যায় ড্যামেজ কন্ট্রোল অভিযান – ওই কর্মকর্তা নিজে সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন তাঁর মন্তব্য বিকৃত করা হয়েছে, আর প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিক্কর বলেন সরকার তার আগের বক্তব্য থেকে সরছে না।

ছবির কপিরাইট Reuters
Image caption আরব সাগরে ভারতীয় নৌবাহিনীর রনতরী।

তিনি জানান, ‘আমরা আগে লিখিতভাবে যা বলেছি সেই বক্তব্যেই অনড় আছি। কোনও চ্যানেল যদি দাবি করে কোস্ট গার্ডের কেউ অন্যরকম কিছু বলেছেন, আমরা নিশ্চয় তদন্ত করব – যদি প্রমাণ হয় সত্যিই তিনি বলেছেন, তাহলে মিথ্যা বিবৃতি দেওয়ার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।’

মি পারিক্কর আরও বলেন, ‘প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আগেই বিবৃতি দিয়ে গোটা ঘটনা জানিয়ে দিয়েছে – এখনও সেটাই আমাদের বক্তব্য এবং ওই বিবৃতিতেই ব্যাপারটা শেষ বলে আমি মনে করি।’

সরকার লুকোচ্ছে কেন : প্রশ্ন কংগ্রেসের

কিন্তু বিতর্ক ধামাচাপা দেওয়ার এই চেষ্টা সত্ত্বেও বিরোধীরা কিন্তু এই ইস্যুতে সরকারকে বিপাকে ফেলার চেষ্টা ছাড়ছেন না। জানুয়ারিতে ওই ঘটনার ঠিক পর পরই যখন কংগ্রেস সরকারি বিবৃতি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল, তখন শাসক বিজেপির অভিযোগ ছিল কংগ্রেসিরা পাকিস্তানের ভাষায় কথা বলছে, তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিচ্ছে।

কিন্তু এদিন কংগ্রেসের পক্ষ থেকে আবারও বলা হয়েছে, মনে হচ্ছে সরকার কিছু লুকোতে চাইছে। দলীয় নেতা মনীশ তিওয়ারি বলছেন, ‘ওই কর্মকর্তা যেখানে পরিষ্কার দাবি করেছেন তিনিই নৌকাটিকে ওড়ানোর নির্দেশ দেন – তাহলে তার তো একটা রেকর্ড বা লিখিত রূপও থাকবে। সরকার কেন সেগুলো প্রকাশ করে বিষয়টা খোলসা করছে না?’

ছবির কপিরাইট indian coast guard
Image caption ভারতীয় কোস্ট গার্ড

তিনি আরও যোগ করেন, ‘জঙ্গী তৎপরতা নিয়ে উদ্বিগ্ন আমরাও – কিন্তু ওই নৌকার যাত্রীরা সন্ত্রাসবাদী না-হয়ে সাধারণ স্মাগলারও তো হতে পারে, যাদের কোনও জঙ্গী মতলব ছিল না? এই প্রশ্নগুলো তো থেকেই যাচ্ছে!’

ফলে নতুন বছরের শুরুতে সরকার যে অভিযানকে জঙ্গী-দমনে বিরাট এক সাফল্য বলে তুলে ধরতে চেয়েছিল, বোঝা যাচ্ছে সেই ঘটনা নিয়ে নানা প্রশ্ন আর সন্দেহ এখন ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে ঘিরে ধরছে।

চিঠিপত্র: সম্পাদকের উত্তর