এমসিজিতে নীল সমুদ্র : ক্রিকেটের সেরা বিজ্ঞাপন

india south africa ছবির কপিরাইট AFP
Image caption দুই সমর্থক

মেলবোর্ন ২২শে ফেব্রুয়ারি

না দেখলে বিশ্বাস হতো না, মেলবোর্ন ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সামনে নীল সমুদ্র। অস্ট্রেলিয়া খেলছে না, অখচ এমসিজি প্রায় ভর্তি – ৮৫ হাজার ক্রিকেট ফ্যান বিশ্বকাপ উপভোগ করছেন – টুর্নামেন্টের জন্য এর চেয়ে ভালো বিজ্ঞাপন বোধ হয় আর হতে পারতো না।

খেলায় হারজিত আছেই, কিন্তু ক্রিকেট যে আজ জিতেছে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। আরো পরিষ্কার করে বললে ৫০-ওভার ক্রিকেটের মধ্যে যে এখনো জীবন আছে – ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকার খেলা সেটা পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়ে গেল।

সকাল থেকেই এমসিজির পাশে ভারতীয় সমর্থকরা ভিড় জমাচ্ছিলেন, আজকের কার্নিভ্যাল এনজয় করবেন বলে। একদল সমর্থক টিম হোটেল – ইয়ারা নদীর পাশে অবস্থিত ল্যাংহ্যাম-এ পৌঁছে গেছিলেন সকাল সকাল।

খবর ছড়িয়ে পড়েছিল, সচিন তেন্ডুলকারও গতকাল এসে গেছেন আজকের খেলা দেখবেন বলে। আর তাই সকাল থেকেই সমর্থকরা আশায় বুক বাঁধছিলেন সচিনকে একবার দেখবেন বলে। ভারতীয় টিমের বাস যখন বেরুলো, তখন ‘সচিন’ ‘সচিন’ আর ‘জিতেগা ভাই জিতেগা ইন্ডিয়া জিতেগা’ আওয়াজ তুললেন তারা।

সব মিলিয়ে খেলা শুরুর তিন-চার ঘন্টা আগে থেকেই বেশ একটা জমজমাট পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল মেলবোর্নে।

সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ছিল ভারতীয় সমর্থকদের পোশাক-আশাক।

একদল সমর্থক – যারা কিনা নিজেদের ‘টুয়েলফ্থ ম্যান’ নামে পরিচয় দেন – ভারতীয় তেরঙা পতাকার আদলে পোশাক বানিয়েছেন। টি-শার্টগুলোর পেছনে প্লেয়ারদের মতো করেই তাদের একেকজনের নাম লেখা। সাথে একটা ৪০ ফুটের বিশাল ভারতীয় পতাকা – যাতে তাদের এই ১২ জনের দলের প্রত্যেকের ছবিও আছে।

এই দলের সবাই হলেন বাল্যবন্ধু। বারো জনই অত্যন্ত সফল কর্মজীবী, ৬ জন এসেছেন মুম্বাই থেকে, আর বাকি ৬ জন কোলকাতার। ভারত যেখানেই খেলুক না কেন – তারা যাবেনই।

দলের প্রধান দীপককে যখন জিজ্ঞেস করলাম তাদের উদ্দেশ্য কি – তার উত্তরটা খুব আকর্ষণীয় ছিল। "ভারতের হয়ে ১১ জন মাঠের মধ্যে খেলে, আর তাদের ওপর ১২ বিলিয়ন লোকের চাপ থাকে। আমরা সবাই তাদের থেকে অনেক কিছু আশা করি। তাই আমরা ঠিক করেছি - যদি কোনদিন তাদের কিছু প্রয়োজন হয়, আমাদের মধ্যে যে কেউই মাঠে নেমে পড়বো ভারতের জন্য। সেই জন্যেই আমরা নিজেদের টুয়েলফথ ম্যান নাম দিয়েছি।"

এনারা এডিলেইডে ছিলেন ভারত-পাকিস্তানের খেলা দেখতে। মেলবোর্নে ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে খেলায়। আবার আসবেন কোয়ার্টার ফাইনালে ভারত উঠলে – যা কিনা এক রকম নিশ্চিত।

বলাই বাহুল্য, এদের সমর্থন ধোনির দলের জন্য বাড়তি অনুপ্রেরণা। তাই তো তারা টুয়েলফথ ম্যান।

মেলবোর্ন ২১শে ফেব্রুয়ারি

ছবির কপিরাইট Getty

মেলবোর্ন শহরটার বিশেষত্ব হলো এখানে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট অত্যন্ত উন্নতমানের। রাত দুটোর সময়ও ট্যাক্সি পেতে মিনিট পাঁচেকের বেশি দাঁড়াতে হয় না। ফোন করে যেকে নেয়া তো আছেই, রাস্তায় দাঁড়ালে ঠিক একটা না একটা ট্যাক্সি হাতের সামনে এসে দাঁড়িয়ে যায়। শহরের বহু বাসিন্দা আছেন যারা পার্কিএর সমস্যার জন্যে নিজেরাও পাবলিক ট্রান্সপোর্ট – হয় ট্রাম বা ট্যাক্সি – ব্যবহার করে থাকেন কাজে যাবার সময়।

আর বিদেশী সাংবাদিক বিশ্বকাপ কভার করতে এসে থাকলে তো কথাই নেই। ট্যাক্সি ড্রাইভারদের সাথে কথা বলে অনেক খবর পাওয়া যায় - যা কিনা এক আলাদা আকর্ষণ।

তবে এই রবিবার কিন্তু মেলবোর্ন শহর বেশ বড়োসড়ো পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সংকটের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে। কারণটা কি?

সেদিন ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা ‘বড় ম্যাচ’। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার সাথে কথা বলে জানতে পারলাম ৭৫ হাজারেরও বেশি টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে, তারা আশা করছেন আরো বেশ কয়েক হাজার টিকিট কাল পরশুর মধ্যে বিক্রি হয়ে যাবে। ৮৫ হাজার লোক রাত দশটার সময় বাড়ি ফিরবে কি করে? অবশ্যই ট্যাক্সি করে। আর সেখানেই সমস্যা।

মেলবোর্নের ট্যাক্সি ড্রাইভারদের অন্তত অর্ধেকই ভারতীয়, আর এরা কেউই এই রবিবার গাড়ি চালাতে রাজী নন। সাধারণের থেকে অনেক বেশি টাকার ব্যবসা হবে জেনেও নয়। তার কারণ, সেদিন এই ট্যাক্সি ড্রাইভাররা সবাই যাবেন এমসিজিতে – ভারতের খেলা দেখতে।

এখন থেকেই তার তোড়জোড় চলছে। কেউ কেউ ট্যাক্সিতে নোটিশ পর্যন্ত লাগিয়ে দিয়েছেন : ‘সানডে নো ট্যাক্সি, ব্যাক মানডে।‘

বেশ কয়েকজনের সাথে কথা বলে বুঝলাম, এরা বেশ দল বেঁধে মাঠে যাচ্ছেন খেলা দেখবেন বলে। আর যারা মাঠে যাচ্ছেন না, তারাও ছুটি নিয়ে বাড়িতে টিভির সামনে বসে পড়বেন বিয়ারের বোতল এবং খাবারদাবার নিয়ে। সেদিন আর যাই করুন না কেন, কাজ করবেন না।

এদেরই একজনের নাম অমিত, আদি বাড়ি জম্মু ও কাশ্মিরে – অস্ট্রেলিয়ায় আছেন ৯ বছর ধরে। তিনি বলছেন, “হাম লোগ সব উসদিন ম্যাচ দেখেঙ্গে। কোই কাম নেহি করেগা। উস দিন আলগ হ্যায়, ভারতকো জিতনা হ্যায়।“

আরেকজন বলছিলেন, “সানডে হাম কোই কাম নেহি করেঙ্গে। উস দিন ছুট্টি হ্যায়। সব মিল বয়েঠকে ম্যাচ দেখেঙ্গে, পার্টি করেঙ্গে।“

ভারত পাকিস্তানকে হারিয়ে দেয়ার পর থেকেই এদের মধ্যে একটা আলাদা উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে। যেন বিশ্বকাপ জেতাই হয়ে গেছে। আর তাই রোববার সবাই ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা খেলা দেখতে যাচ্ছেন খোলা মন নিয়ে। কোয়ার্টার ফাইনালে যে টিম উঠবেই, সেটা একরকম নিশ্চিত।

আর তাই এই রবিবার এমসিজিতে ‘কার্নিভ্যাল এ্যাটমোস্ফিয়ার’ লক্ষ্য করা গেলে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। সেই টেনশনটাই উধাও হয়ে গেছে, আর বিশ্বকাপ এখন যেন শুধুই একটা উপভোগ করার ‘স্পেকট্যাকল’।

তবে খেলা দেখতে গিয়ে রাতে বাড়ি ফিরবেন কিভাবে সেটা কিন্তু দর্শকদের এখন থেকেই ভেবে রাখতে হবে। ট্রাম না পেলে বা বেশি ভিড়ের জন্য ট্রামে উঠতে না পারলে হাটা ছাড়া বিশেষ উপায় থাকবে না।

সেই এক রাতের জন্য অঘোষিত ট্যাক্সি বনধ!

মেলবোর্ন, ২০শে ফেব্রুয়ারি

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption ক্যানবেরায় ১৮ই ফেব্রুয়ারি আফগানিস্তানের সঙ্গে ম্যাচে উচ্ছ্বাসমুখর বাংলাদেশি সমর্থক

মেলবোর্নে যে এত বাংলাদেশি সমর্থক আছেন তা চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না। আফগানিস্তান ম্যাচের পর তারা যেন হঠাৎ করেই সামনে এসে পড়েছেন । বাংলাদেশের প্রথম খেলার আগে কেউই সেরকম সাহস করে কিছু বলতে পারছিলেন না। সবার মনেই যেন একটা চাপ কাজ করছিল ।

এমনকী বাংলাদেশি সাংবাদিকরা বাংলাদেশ দলের অধিনায়কের প্রেস কনফারেন্সে এমনভাবে জেরা করার মত প্রশ্ন করছিলেন, যার মধ্যে দিয়েও সেই চাপই ফুটে বেরচ্ছিল – ‘‘কেন এখনও আমরা জিতছি না- এত বছর পরেও কেন দলের মধ্যে কোনো ধারাবাহিকতা নেই- কেন এখনও আমাদের সাথে অন্যান্য ছোট দলের তুলনা করা হচ্ছে?’’- এইসব অস্বস্তিকর প্রশ্ন বাংলাদেশ দলের সংবাদ সম্মেলনে একটা নিয়মে পরিণত হয়েছিল।

আফগানিস্তানকে হারিয়ে দেওয়ার পর দলের ওপর থেকে চাপটা অনেকাংশেই কমে গেছে। বাংলাদেশ অত্যন্ত ভাল খেলায় সমর্থকরাও এখন আশায় বুক বাঁধছেন কোয়ার্টার ফাইনালের দরজা বোধহয় খুলে গেল। বেল স্ট্রিট, কেম্প স্ট্রিট অঞ্চলে হাঁটতে হাঁটতে কালকে বেশ কিছু বাংলাদেশি দোকানে ঢুকেছিলাম। সকলেই যেন একটা নতুন উদ্দীপনা নিয়ে বিশ্বকাপ দেখছেন গত কয়েকদিন।

‘‘আগামীকাল- শনিবার যদি আবহাওয়ার কারণে অস্ট্রেলিয়ার সাথে খেলাটা ক্যানসেল হয়ে যায় – আমরা কোয়ার্টার ফাইনালে উঠবই’’, বললেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহিলা ফ্যান, যার দোকান আছে মেলবোর্নে। তার স্বামী এখানের এক নামী রেস্তোঁরায় শেফ এবং স্বামী-স্ত্রী দুজনেই পরিকল্পনা করেছেন অন্তত দুটো বাংলাদেশের খেলা মাঠ থেকে দেখবেন।

এখানেই শেষ নয়, বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়া খেলার দিন রেস্তোঁরায় স্পেশাল মেনুর আয়োজনও করা হয়েছে। ঢাকার আদলে তিন চাকার অটো রিকশা আর অর্ধেক রেস্টুরেন্টের গেটে লাগানো মেনুতে উপমহাদেশের প্রিয় সব খাবার। ইলিশ না পেলেও স্থানীয় রেড স্ন্যাপার দিয়ে মাছের বন্দোবস্ত হয়েছে। খেলাটাকে উপলক্ষ করে একটা পুরোদস্তুর কার্নিভালের ব্যবস্থা । এখন শুধু একটাই অপেক্ষা- বাংলাদেশ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অঘটনটা ঘটিয়ে দিক্‌ !

বাংলাদেশ প্রথম ম্যাচ জেতার পর সোসাল মিডিয়াতেও যথেষ্ট সাড়া পড়ে গেছে। কয়েকজন ভক্ত এমনও বলেছেন যে আফগানিস্তানকে এটা একটা যোগ্য জবাব দেওয়া হয়েছে। আফগানরা নাকি বড় বেশি ‘‘উদ্ধত হয়ে উঠেছিলেন গত বছর বাংলাদেশকে হারিয়ে’’।

অনেক বাংলাদেশি ফ্যানই এখন তাকিয়ে আছেন ব্রিসবেনে সত্যিই কোনো ঘূর্ণিঝড় আসে কীনা তা দেখার জন্য। যদি আসে এবং অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে খেলাটা ভেস্তে যায়, তাহলে বাংলাদেশ অতি মূল্যবান কয়েকটা পয়েন্ট পেয়ে যাবে। আর যদি তা হয় তাহলে ইংল্যান্ড এবং শ্রীলঙ্কার ওপর যথেষ্ট চাপ বাড়বে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে খেলার সময়।

সব মিলিয়ে টাইগারদের বিশ্বকাপ কিন্তু যথেষ্ট উজ্জ্বল দেখাচ্ছে তা সে যতই বৃষ্টি এসে খেলা পন্ড করার হুমকী দিক না কেন?

মেলবোর্ন, ১৮ই ফেব্রুয়ারি

ছবির কপিরাইট Getty images
Image caption মাইকেল ক্লার্ক (বাঁয়ে) এবং ফিল হিউস ডারবানে ২০০৯ সালে অস্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকা টেস্টের সময়

অস্ট্রেলিয়ার ক্যাপ্টেন মাইকেল ক্লার্কের সাথে কথা বলতে গিয়ে একরকম অবাক হয়েছিলাম। হঠাৎ করে তার ফোনের দিকে চোখ যেতেই স্ক্রিনে দেখতে পেলাম একটি সাদা কালো ছবি, যেটি বোঝাই যাচিছলো যে ফটোশপ করা।

জিজ্ঞাসু চোখে ক্লার্কের দিকে তাকালাম এমনভাবে যে ব্যাপারখানা কি? ক্লার্ক আমার চাহনি লক্ষ্য করে বললেন ছবিটা তার এবং ফিল হিউজের। যখন তারা শেষ বার ডিনারে গিয়েছিলেন একসাথে। দুবাইতে ২০১৪ সালের অক্টোবরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলতে গিয়েছিলো অস্ট্রেলিয়া। হিউজের মৃত্যুর পর থেকেই ছবিটা তার ফোনে স্ক্রিন সেভারে।

ভুল বললাম। ছবিটা আসলে তোলা হয়েছিলো রঙ্গিন। কিন্তু হিউজ বেঁচে না থাকায় ক্লার্ক সেটা নিজেই ফটোশপ করে সাদাকালো করে নিয়েছেন। তিনি মনে করেন হিউজ বেঁচে না থাকলেও তার কাছে আছেন এবং দিনে অনেকবারই এ ছবিটা তিনি দেখেন বন্ধুর স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে।

ক্লার্ক বললেন, “আমি প্রত্যেক দিন ফিল হিউজকে সম্মান করি। ঘুম থেকে ওঠা বা ব্যাট করতে নামার সময়। ফিলকে আমার পক্ষে কোনদিনই ভোলা সম্ভব নয়। আমি সব ক্রিকেট অনুরাগীর কাছে ঋণী। তারা যেভাবে ফিলের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ভারতীয় দল যে ফিলের শেষ অনুষ্ঠানে এসেছিলো সেটা আমার কাছে অত্যন্ত তৃপ্তির। আমার হয়তো কেঁদে ফেলা ঠিক হয়নি তবে আমি কান্না চেপে রাখতে পারিনি।”

তবে কি ফিল হিউজ ক্লার্কের কাছে বাড়তি অনুপ্রেরণা ? ক্লার্ক কি এই বিশ্বকাপটা তার প্রিয় বন্ধু এবং ভাই ফিল হিউজকে উৎসর্গ করতে চান ? সেটাই কি ফিলের জন্য শ্রেষ্ঠ উপহার হতে পারে ? একমত হলেন ক্লার্কও।

“অস্ট্রেলিয়ার হয়ে বিশ্বকাপ খেলতে কোন আলাদা অনুপ্রেরণার দরকার হয়না। সবাই দেশের জন্য তাদের সেরাটা দিতে চায়। তবে এটা শতভাগ ঠিক ফিল এবারে একটা আলাদা মাত্রা এনে দিয়েছে। আমি চাইবো বিশ্বকাপটা ফিলকে উৎসর্গ করতে, ওর স্মৃতির জন্য জিততে। আমি জানি ট্রফিটা আমরা জিতলে ফিল ভীষণ খুশি হবে।”

বলতে বলতে হঠাৎই ক্লার্কের চোখ চলে যাচ্ছিলো ফোনের দিকে এবং বারবারই তিনি ছবিটা দেখছিলেন।

ফিল হিউজ হয়তো আর কোনদিনই ফিরে আসবেন না। তবে ক্রিকেট মাঠে তিনি হয়তো বেঁচে থাকবেন চিরকাল। তা সে ডেভিড ওয়ার্নারই হোন বা ক্লার্ক, তারা কেউই ফিল হিউজকে কোনদিন ভুলতে পারবেননা।

ওয়ার্নার খুব সুন্দরভাবে বললেন- “যতবারই আমি ৬৩ করবো ততবারই আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিলকে স্মরণ করবো। ৬৩-টা ফিলের জন্য। ওতো আমাদের ছেড়ে যায়নি। সবসময়ই আমাদের সাথে আছে। আমাদের মনে আছে, অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের অনুপ্রেরণা হিসেবে বেঁচে আছে এবং থাকবে।’’

ফিল হিউজ আর নেই কিন্তু চিরজীবী হোন ফিল হিউজ।

মেলবোর্ন, ১৭ই ফেব্রুয়ারি

ছবির কপিরাইট REUTERS

বিশ্বকাপ ক্রিকেট ২০১৫-র মাত্র তিন দিন পার হলো, আজ চতুর্থ দিন।

কিন্তু 'মর্নিং শোজ দ্য ডে' এই কথা মানলে বলতে হবে, অন্তত দর্শকসংখ্যার বিচারে এই বিশ্বকাপ কতটা সফল হতে যাচ্ছে - তা নিয়ে বোধ হয় এখন আর কারো মনে কোন সন্দেহ নেই।

বিশ্বকাপের দিক থেকে দেখলে শুরুটা বোধ হয় এর থেকে ভালো আর কিছুই হতে পারতো না।

১৪ই ফেব্রুয়ারি অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডএর খেলায় ৯০ হাজার দর্শক, নিউজিল্যান্ড-শ্রীলঙ্কায় ম্যাচে প্রায় ২৫ হাজার এবং ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে ৪২০০০ দর্শক – টুর্নামেন্টের প্রথম তিন দিনেই এই আগ্রহ উন্মাদনা অভাবনীয়।

ভারত-পাকিস্তান ম্যাচটি ম্যাচ টিভিতে যে পরিমাণ লোকে দেখেছে - তার সংখ্যা ছিল ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

এর জন্য আয়োজকদের সাধুবাদ দিতেই হবে। তারা বুদ্ধি করে প্রথমেই ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া এবং ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ রাখাতে, বিশ্বকাপের শুরুটাই হয়ে গেল স্বপ্নের। ৫০-ওভার ক্রিকেটের ভবিষ্যতের জন্য এই চিত্রটি বোধ হয় দরকার ছিল।

গত বছরগুলোতে খুব আলোচনা হচ্ছিল যে ৫০ ওভারের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ কতটা নিশ্চিত। টেস্ট ক্রিকেট এবং টি২০ ক্রিকেটের মাঝে ৫০-ওভারের ক্রিকেটের মৃত্যু হয় কীনা?

কিন্তু এই বিশ্বকাপের প্রথম তিনদিন দেখে আমি কিন্তু সেসব প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই পেয়ে গেছি।

বাণিজ্যিক দিকের বিচারেও এই বিশ্বকাপের শুরুটা এর চেয়ে ভালো হয়তো হতে পারতো না। টিভিতে ক্রিকেট দর্শক সংখ্যার দিক দিয়ে, রোববারের ভারত-পাকিস্তানের ম্যাচ সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

এই পরিসংখ্যান আইসিসিকে একদিনের ক্রিকেট নিয়ে অনেকটাই উৎসাহিত করবে।

অ্যাডেলেইডে রোববার ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ কতটা দর্শনীয় ছিল তা নিয়ে হয়তো বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু ভক্তদের আবেগ-উচ্ছাসের সেই চিত্র আজীবন মনে রাখার মতো।

অ্যডেলেইড খুব বড় শহর নয়। সেখানে জড়ো হয়েছিলো চল্লিশ হাজারেরও বেশি ভারতীয় এবং পাকিস্তানী ফ্যান। আমার দু'দশকের ক্রিকেট কাভার করার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, বিদেশের মাটিতে নিজেদের দেশের দলকে নিয়ে এই উন্মাদনা আমি আগে কখনো দেখিনি।

আ্যাডেলেইড শহরের কেন্দ্রে রাত বারোটায় সারি বেঁধে ভারতীয়রা 'হাম হোঙ্গে কামিয়াব' গাইছেন, এক অন্যকে আলিঙ্গন করছেন—বিদেশের মাটিতে এই দৃশ্য আমি অন্তত দেখি নি।

তবে মনে রাখতে হবে বিশ্বকাপ সবে শুরু হয়েছে। এই উৎসাহ ধরে রাখাটাই আসল চ্যালেঞ্জ।

ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া বা ভারত-পাকিস্তানের মতো হাই প্রোফাইল ম্যাচ হাতে গোনা ক'টি। বাকি ম্যাচগুলোতে মাঠে দর্শক না এল ৫০-ওভার ক্রিকেট নিয়ে সন্দেহ অব্যাহত থাকবে।

তবে প্রথম তিন দিন বিশ্বকাপ সেই সন্দেহ দূরে রাখতে পেরেছে।

অ্যাডেলেইড, ১৪ই ফেব্রুয়ারি

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption ভারত ও পাকিস্তানের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনার পারদ এখন তুঙ্গে

ভারত পাকিস্তান খেলা শুরু হতে আর বেশি দেরি নেই । খেলা নিয়ে একদিকে যেমন উত্তেজনার পারদ চড়ছে এবং সমর্থকদের মধ্যে একধরনের অদ্ভুত উন্মাদনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, অন্যদিকে দুই দলের খেলোয়াড়দের কিন্তু অনেকধরনের চাপ সামলাতে হচ্ছে- যার মধ্যে রয়েছে অনেক কিছু না করতে পারার চাপ।

প্রথমে ভারতীয় দলের দিকে তাকানো যাক্‌। ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট সমস্ত প্লেয়ারকে পরিস্কার জানিয়ে দিচ্ছে তারা কী কী করতে পারবেন না।

প্লেয়ারদের টুইটার ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আছে – বা বলা যেতে পারে যে তারা যেন অত্যন্ত বিবেচনা করে টুইট করেন- এমনটাই বলা হচ্ছে।

ফেসবুকে নতুন বন্ধু করতে পারার ওপরেও নিষেধাজ্ঞা আছে। আবার নতুন কোনো স্পনসরশিপ চুক্তি খেলোয়াড়রা বিশ্বকাপ চলাকালীন করতে পারবেন না- কোনো এজেন্ট বা স্পনসরের সাথে কথাও বলতেপারবেন না।

ম্যাচ ফিক্সিং-এর ভূত এখন ক্রিকেটে এমনভাবে জাঁকিয়ে বসেছে যে বিশ্বকাপও তার বাইরে নয়। এবং ভারতীয় ক্রিকেটারদের এমনও বলা হচ্ছে যে তারা কোনো ব্যক্তিকে – সে যতই পরিচিত হোন্‌ না কেন- ঘরে ডাকতে পারবেন না- তাদের সাথে কথাও বলতে পারবেন না।

যেটা সবচেয়ে অদ্ভুত সেটা হল ভারতীয় মিডিয়া ম্যানেজার ভারতীয় সাংবাদিকদের পর্যন্ত বলছেন যে তারা প্লেয়ারদের ‘হ্যালো’ পর্যন্ত বলতে পারবেন না। বললে তা নাকি নিয়ম-বহির্ভূত কাজ হবে।

এমন ঘটনা আগে কোনোদিন কোনো বিশ্বকাপে হয়েছে কীনা সন্দেহ।

পাকিস্তানের আবার অন্য সমস্যা।

টিমে ডিসিপ্লিন আনার চেষ্টায় পাকিস্তান টিম ম্যানেজমেন্ট আটজন প্লেয়ারকে ৩০০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার করে জরিমানা করতে বাধ্য হয়েছেন রাতের খাওয়া খেয়ে ৪৫ মিনিট দেরি করে ফেরার জন্য। বলা হয়েছে তারা নাকি কারফিউ ভেঙেছেন এবং সেই কারণে তাদের এমনও বলা হচ্ছে যে যদি আরেকবার তারা এমন করেন তাদের তৎক্ষণাৎ পাকিস্তান ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

এই আটজনের মধ্যে সিনিয়ার প্লেয়াররাও রয়েছেন। শাহিদ আফ্রিদি, উমর আকমল, আহমেদ শেহ্‌জাদ- এরা প্রত্যেকেই এই ৩০০ ডলার জরিমানা দিতে বাধ্য হয়েছে সিডনিতে টিম কারফিউ ভাঙার কারণে।

প্রশ্ন করা যেতেই পারে এইধরনের ডিসিপ্লিন কি বিশ্বকাপের মত টুর্নামেন্টে খেলোয়াড়দের পক্ষে ভাল নাকি এগুলো এক একটা বজ্রআঁটুনির মত যা কীনা খেলোয়াড়দের আরো বেশি করে চাপের সম্মুখীন করে তোলে? গ্যারি কার্সটিনের সাথে কথা বলে মনে হল সাউথ আফ্রিকা টিমে কিন্তু এসব কিছুই নেই।

কার্সটিন যা বল্লেন তার সারমর্ম হল “প্লেয়াররা কেউই ছেলেমানুষ নন। তাই এসব করে কোনো লাভ হয় বলে তো মনে হয় না। দেশের জন্য খেলাটা সবচেয়ে বড় ইন্সপিরেশন- অনুপ্রেরণা। বরং এইসব ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশনের উল্টো ফল হতে পারে।“

এখন দেখার ভারত এবং পাকিস্তান এই সমস্ত চাপ সামলে রবিবার তাদের সেরা খেলাটা দর্শকদের উপহার দিতে পারে কীনা!

অ্যাডেলেইড, ১২ই ফেব্রুয়ারি

ছবির কপিরাইট bbc
Image caption জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান

এই লেখা যখন পাঠকরা পড়া শুরু করেছেন, বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সদ্য শেষ হয়েছে। নব্বই হাজার দর্শক ভর্তি মেলবোর্নের মাঠে অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড ম্যাচের আর ঠিক ২৪ ঘণ্টা বাকি।

অ্যাডেলেইডে নেমেই বুঝতে কষ্ট হয়নি বড় কোনো উৎসবের জন্য প্রস্তুত অস্ট্রেলিয়া।

টেরেন্স নদী পেরিয়ে অ্যাডেলেইড ওভালের কাছে যেতেই উৎসবের আমেজটা টের পেলাম।

তৈরি হয়েছে ফ্যান জোন। এমনকি সেই সাথে লাউড স্পিকারে 'শিলা কি জওয়ানি' বা 'চাক দে ইন্ডিয়া' ধরণের বলিউডের গানের সুর। কারণ দুদিন বাদেই এই ওভালেই মুখোমুখি হচ্ছে ভারত ও পাকিস্তান।

এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের টিকিট বিক্রি হয়েছে আট লাখেরও বেশি। এর মধ্যে বহু টিকেট কিনেছেন পৃথিবীর নানা প্রান্তের ক্রিকেট অনুরাগীরা।

বিশ্বকাপ শুরুর আগে ফ্যানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্ন হলো– কে জিতবে ক্রিকেটের শ্রেষ্ঠ এই সম্মান? কোনো অঘটন কি ঘটবে? নায়ক হয়ে দেখা দেবেন কে? কে হবেন ট্র্যাজিক নায়ক?

নিঃসন্দেহে বলা যায় সবচেয়ে ওপেন একটি বিশ্বকাপ হচ্ছে এটি। খেতাব জেতার সম্ভাবনা অন্তত ছয়টা দেশের।

সে কারণে হয়ত অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক আমাকে বললেন, "অস্ট্রেলিয়া দলে গভীরতা আছে ঠিকই, কিন্তু সতর্ক থাকতে হবে, আমরা যেন ঠিক সময়ে শ্রেষ্ঠ খেলাটা খেলতে পারি"।

বিশ্বকাপ একটা লম্বা টুর্নামেন্ট। সঠিক সময়ে নিজের সেরা খেলাটা অবশ্যই জরুরি। তাই এখনই কি ফেভারিট বেছে নেওয়া সম্ভব?

২০১১ সালে যেমন উপমহাদেশের দলগুলোর রমরমা ছিল, এবারে কী অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি?

যতজন বিশেষজ্ঞের সাথে গত ক'দিনে আমার কথা হয়েছে, প্রত্যেকেই একমত যে এই তিনটি দলই সেমিফাইনালে ওঠার দাবিদার।

বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড ঘরের মাঠে খেলার সুবিধা তো পাবেই, এছাড়া দুটো দলের মধ্যে গভীরতা অনেক।

অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য এবারের বিশ্বকাপ শ্রেষ্ঠ সুযোগ। দলের দুই প্রধান স্তম্ভ - এবি ডিভিলিয়ার্স এবং হাশিম আমলা- এ মুহূর্তে তাদের ব্যাটিং ফর্মের তুঙ্গে। তাছাড়া, মরনি মরকল এবং ডেল স্টেন অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডের উইকেটের জন্য আদর্শ দুই বোলার।

কোন দল জিতবে তা নিয়ে যেমন আলোচনা, তেমনি কোন ক্রিকেটার তার সেরাটা বিশ্বকাপের মঞ্চে তুলে ধরবেন তা নিয়েও অনেক জল্পনা চলছে।

মাইকেল ক্লার্ককে জিজ্ঞেস করেছিলাম। অনেকক্ষণ ধরে ভেবে তিনটি নাম বললেন - মিচেল জনসন, ডিভিলিয়ার্স এবং ভিরাট কোহলি।

চিঠিপত্র: সম্পাদকের উত্তর