লন্ডনের পার্লামেন্ট স্কয়ারে গান্ধীর ভাস্কর্য

লন্ডনের প্রাণকেন্দ্রে পার্লামেন্ট স্কয়ারে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলেনর নেতা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর প্রায় ৯ ফিট দীর্ঘ একটি ব্রোঞ্জের মূর্তি বসানো হয়েছে। এই মূর্তিটি উদ্বোধন করা হয়েছে শনিবার।

পার্লামেন্ট স্কয়ারের প্রায় মাঝখানেই গান্ধীর পুরনো প্রতিপক্ষ সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার উনস্টন চার্চিলের ভাস্কর্যের উল্টোপাশেই বসানো হচ্ছে এই ভাস্কর্য।

যে ব্রিটিশ সরকার একসময় গান্ধীকে নিয়ে বিদ্রুপ করেছে, তারা এখন এ মানুষটির নিরহঙ্কার এবং অহিংস উপায়ে তৎকালীন ব্রিটিশ সম্রাজ্যের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করছে।

ভাস্কর্যটি নির্মানে খরচ হয়েছে প্রায় দশ লাখ পাউন্ড। যে অর্থ সংগ্রহ করেছে লর্ড মেঘনাদ দেসাইয়ের নেতৃত্বে গান্ধি স্ট্যাচু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট। ।

“এটি খুব দারুণ একটি জায়গা। একপাশে চার্চিল, আর গান্ধী তাকিয়ে আছেন পার্লামেন্টের দিকে। তিনি এবং ভারতীয় ন্যাশনাল কংগ্রেস যে উপায়ে স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করেছে, সেকারণেই ভারত এখন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তারা গণতান্ত্রিক এবং বৈধভাবে লড়াই করেছে। এমনকি তারা আইনও ভেঙ্গেছে বৈধভাবে এবং তার পরিণতি ভোগ করতেও তারা পিছপা হয়নি।” বলেন লর্ড দেসাই।

গান্ধী সবসময়ই ছিলেন কিছুটা বিতর্কিত চরিত্র। ১৯৩১ সালে স্বাধীনতার বিষয়ে আলোচনা করতে তিনি যখন লন্ডনে আসেন, তখন মধ্য লন্ডনের ধনী এলাকা ছেড়ে পূর্ব লন্ডনের দারিদ্রপিড়ীত এলাকায় থেকে সবাইকে অবাক করে দেন।

সেসময় দেয়া বক্তব্যে গান্ধী বলেন, আলোচনার ফলাফল যাই হোক না কেন, তিনি পূর্ব লন্ডনের দরিদ্র মানুষদের সাথে থাকার সুন্দর স্মৃতি নিয়েই দেশে ফিরতে চান।

তবে পশ্চিমা বিশ্বে গান্ধীর প্রতি সম্মান দিন দিন বাড়লেও, তার নিজ দেশ ভারতে তাকে অনেকে মুসলিমপন্থী এবং ভারতকে দুটি রাষ্ট্রে বিভক্ত করার জন্য দায়ী করে সমালোচনা করছে। এবং এই সমালোচনাকারীদের সংখ্যাও বাড়ছে।

সম্প্রতি ভারতের হিন্দু উগ্রবাদিরা মি. গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গডসের সম্মানে একটি মন্দির তৈরিরও উদ্যোগ নিয়েছে।

কিংস কলেজ লন্ডনে ভারতীয় রাজনীতি বিষয়ের অধ্যাপক ক্রিস্টফ জ্যাফ্রেলোও সেই ঘটনার দিকেই ইঙ্গিত করে বলেন, “গান্ধীর হত্যাকারী ছিল একজন হিন্দু জাতীয়তাবাদী। সে গান্ধীকে মুসলিমপন্থী হিসেবে দেখেছিল এবং সেকারণেই তাকে হত্যা করে। এখন জঙ্গি গোষ্ঠিগুলো ছাড়াও কেউ কেউ গডসেকে নায়ক বলে মনে করে, কারণ তাদের ধারণা গডসে জাতির জন্য ভালো কিছু করেছে।”

তবে গান্ধীকে ভালবাসতেন এমন অনেকেও এই মূর্তির বিপক্ষে। যেমন তার একজন দৌহিত্র অরুণ গান্ধি। দাদাকে যখন হত্যা করা হয়, তখন তার বয়স ছিল ১৪ বছর। তিনি মনে করেন, এই ভাস্কর্যটি তার দাদার আদর্শের সাথে যায় না।

তিনি বলেন, “আমার মনে হয় এটি প্রচুর অর্থের অপচয়। তিনি কখনোই এমন কিছু চাননি যে মানুষ তার মূর্তি তৈরি করুক। তিনি চেয়েছেন, মানুষ তার বার্তাটি গ্রহণ করবে এবং সারা পৃথিবীর কষ্টে থাকা মানুষদের মাঝে শান্তি নিয়ে আসবে।”

অরুণ গান্ধী বলেন, যেই ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে গান্ধী আন্দোলন করেছেন, তাদেরকেও শত্রু বলতে নারাজ ছিলেন তিনি। বরং তাদেরকে বন্ধু হিসেবে দেখেছেন, যারা ভুল পথে চলছে।

কিন্তু ভাগ্যের সবচেয়ে বড় পরিহাসটি সম্ভবত: ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থার যে অন্যতম ব্যক্তিত্ব গান্ধীর সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছিলেন এখন তার মূর্তির পাশেই অবস্থান করছে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতার এই মূর্তি।