নদীপথে বিবিসি বাংলার কাদির কল্লোল

কোথায় কোথায় যাচ্ছেন কাদির কল্লোল?

৯ই এপ্রিল ২০১৬, শনিবার, কাউনিয়া: তিস্তাপারে কাউনিয়া- বাঁধ, জলসঙ্কট এবং অন্যন্য স্থানীয় ইস্যু নিয়ে মানুষের কথা শুনতে ক্লিক করুন।

১০ই এপ্রিল ২০১৬, রোববার, চিলমারী বন্দর: ব্রহ্মপুত্র নদের ধারে চিলমারী বন্দরের বর্তমান অবস্থা নিয়ে শুনুন আলোচনা। এখানে ক্লিক করুন।

১১ই এপ্রিল ২০১৬, সোমবার, সারিয়াকান্দি: ভরদুপুরে সূর্য মাথার ওপর রেখে যখন একটি ব্রিজে উঠলাম, ভেবেছিলাম, এটি কোন শীর্ণ খাল। সরু জায়গায় অল্প পানি বইছে। পাশে বিস্তীর্ণ এলাকায় ধান চাষ করা হয়েছে।

ছবির কপিরাইট bbc
Image caption বাঙ্গালি নদীর মাঝে ধানক্ষেত। প্রথম দেখায় বোঝা মুশকিল এটা নদী কীনা।

আমার সাথে থাকা স্থানীয় একজন সাংবাদিক জানালেন, আমরা বাঙ্গালি নদীর ওপর দিয়ে যাচ্ছি। ব্রিজ পার হয়েই সারিয়াকান্দির সীমান্ত। সেখানে গাড়ি থেকে নেমে নদীটির বেহাল দশার কিছু ছবি নিলাম। ছোট্ট উপজেলা শহরটির একটি বাজারে পরিচয় হয় সার ব্যবসায়ী নজরুল ইসলামের সাথে। সাংবাদিক পরিচয় শুনেই মি. ইসলাম বলেন, “পশ্চিমে বাঙ্গালি নদী আর পূর্বে যমুনা মিলিত হওয়ার জন্যে আমাদের চাপ দিতেছে। দুই নদী মিলিত হলে আমাদের সর্বনাশ।” এমন কথা শুনে তাঁকে ভিডিও করতে চাইলে তিনি রাজি হয়ে যান। ক্যামেরার সামনে নিজের নাম বলার পরেই তাঁর কথা আটকে যায়। প্রচণ্ড রোদের মধ্যে কয়েক দফা চেষ্টার পর শেষ পর্যন্ত তিনি বিরক্ত হয়ে কিছু কথা বলে ফেলেন। সেই কথাই আমার কাজে লেগে যায়। সারিয়াকান্দিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন কর্মকর্তা অনানুষ্ঠানিক আলাপে বলছিলেন, এখানে বাঙ্গালি এবং যমুনা নদী মিলিত হবার জন্য খুব চেষ্টা করছে। কয়েকটি জায়গায় তারা খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। বাংলাদেশে এই প্রথম এধরনের মিলন ঠেকাতে প্রকল্প নেয়া হয়েছে। একথা বলে ঐ কর্মকর্তা মজা করে হেসে বললেন, “ভাই ঘটনা বুঝেছেন তো? তবে আমাকে কোট করবেন না।” দুই নদীর মিলন ঠেকাতে পাড়-টিপপোড়ল গ্রামে যেখানে নতুন বাঁধ দেয়া হয়েছে, সেখান থেকে সন্ধ্যায় বিবিসি বাংলার প্রবাহ অনুষ্ঠানে বাসিন্দাদের কয়েকজনকে নিয়ে সরাসরি অনুষ্ঠান করি। কথা বলার মত লোক খুঁজতে খুঁজতে অনুষ্ঠানের ঠিক আগ মুহূর্তে পেয়ে যাই। শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানটি ভন্ডুল হয়নি। বাঙ্গালি নদীর ধারে সারিয়াকান্দির মানুষের আশা-আকাঙ্খার শুনতে এখানে ক্লিক করুন।

১২ই এপ্রিল ২০১৬, মঙ্গলবার, ভূয়াপুর: বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব দিকে যমুনার তীর ধরে একটি রাস্তা টাঙ্গাইলের ভূয়াপুর চলে গেছে। দুপুরের আগে আমি যখন সেই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন চোখে পড়ছিল সারি সারি বালু সংগ্রহের ঘাট।

ছবির কপিরাইট bbc bangla
Image caption যমুনা তীরে বালু সংগ্রহের সব ঘাটই অবৈধভাবে করা হয়েছে।

অল্প কিছু দূর যাবার পর ঘাটের কাছে একটি বাজারে থেমেছিলাম। সেখানে একজন বালু শ্রমিক আবদুল জব্বার বলছিলেন, তিনি নিজে একটি অবৈধ ঘাটে কাজ করেন এবং বালু সংগ্রহের সব ঘাটই এখানে অবৈধভাবে করা হয়েছে। বালুর এই ব্যবসা নিয়ে ভূয়াপুরের মানুষ মুখ খুলতে ভয় পান। কারণ এর মালিকরা প্রভাবশালী। এই ঘাট গজানোর পেছনে মোটা অংকের অর্থ এবং রাজনৈতিক শক্তিও কাজ করে। এই ইস্যুতেই বিবিসি বাংলার আলোচনা অনুষ্ঠানে একজন অতিথি কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “এসব ঘাটের মালিকেরা ভয়ংকর। কথা বললে জীবনের হুমকিও আসতে পারে।” তবে সাহস করে কেউ কেউ যে প্রতিবাদ করেন না তা কিন্তু নয়। এমনই একজন ৮০-বছর বয়স্ক আবদুল মজিদ মিয়া আমাদের আলোচনায় বলেছেন, তারা মানব বন্ধন সহ নানান ধরনের কর্মসূচি পালন করেছেন, প্রশাসনের সাথেও বহু আলোচনা করেছেন, কিন্তু অবৈধ বালুর ঘাট গজানো বন্ধ হয়নি। বালুর ঘাটের মালিকরা কোন কথা বলতে রাজি নন। দু’জন বালুর ব্যবসায়ী আমাদের আলোচনায় অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কয়েক দিন আগে। কিন্তু অনুষ্ঠানের ঠিক আগ মুহূর্তে তারা আসতে পারবেন না বলে জানিয়ে দেন। স্থানীয় প্রশাসনেরও একটিই বক্তব্য, বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে অবৈধ ঘাটের বিরুদ্ধে তারা ব্যবস্থা নিচ্ছেন। যদিও সাধারণ মানুষের কাছে তা দৃশ্যমান নয়। মানুষের সেই উদ্বেগ উঠে এসেছে বিবিসির আলোচনা অনুষ্ঠানে। যমুনা পারে ভুয়াপুরের কথা শুনতে এখানে ক্লিক করুন

১৩ই এপ্রিল ২০১৬, বুধবার, লৌহজং: পদ্মা নদীর উত্তর তীরে লৌহজং উপজেলার দশটি ইউনিয়নেই নদী ভাঙ্গা মানুষের বসত। তাদের একটি বড় অংশই পদ্মার বিভিন্ন চরে ভাঙ্গনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এখানে বসত গড়েছেন।

ছবির কপিরাইট BBC Bangla
Image caption লৌহজং-এ পদ্মার পাড়

দুপুরে পদ্মার তীরে এসেই কয়েক জন গ্রামবাসীর সাথে কথা হচ্ছিল। পদ্মার চরের জমি নিয়ে সংঘাত সেখানে বেড়েই চলেছে। সেই সাথে এখন পদ্মায় ইলিশের অভয়ারণ্য দখলে রাখা নিয়েও সংঘাত হচ্ছে। নদীর একটি ঘাটে নৌকার মাঝি আনিস মোল্লা জানান, দু’বছর আগে পদ্মার পূর্ব অংশে ছোট একটি নতুন চর জাগলে তিনি সহ বেশ কয়েকজন নদী ভাঙ্গা মানুষ সেখানে চাষাবাদ শুরু করেছিলেন। ফলন ভাল হওয়ায় পরের বছর পাশের চরের প্রভাবশালীরা তাদের চর দখল করে নিয়েছে। পদ্মার চরগুলো ধানসহ যেকোন ফসল ফলানোর জন্য পুরোপুরি উপযোগী। সেকারণেই নতুন চর জাগলে ক্ষমতাবান বা প্রভাবশালীরা তাতে নজর দেয়। এছাড়া অনেক চর যেহেতু নদীতে বিলীন হয়ে যায়, সেই চরের বাসিন্দারাও নতুন চরে গিয়ে নিজেদের জমি দাবি করেন। চরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে নদীর পাড়ে আসা তানিয়া বেগম বলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা এমন পরিস্থিতেই রয়েছেন। যে চরটি যে গোষ্ঠি দখল করে রাখছে, তারা ঐ চরের কাছে পদ্মায় ইলিশের অভয়ারণ্য নিয়ন্ত্রণে রাখছে। জেলে সোহরাব ফকির বলছিলেন, “পদ্মায় এই অঞ্চলের ইলিশ বেশি সুস্বাদু হয়। কিন্তু এই ইলিশের জন্য জলদস্যু এবং লাঠিয়ালরা নদীই দখল করে রাখছে। আমাদের সাধারণ জেলেদের মাছ ধরতে দেয় না।“ চর দখলের সাথে ইলিশ নিয়ে নতুন সমস্যার বিষয়ও উঠে এসেছে বিবিসির আলোচনায়। বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় বিবিসি বাংলার অনুষ্ঠানে লৌহজংএ ফেরি ঘাট থেকে যখন সরাসরি আলোচনা শুরু করবো, সেই মুহূর্তেই আমাদের স্যাটেলাইট সংযোগ কেটে যায়। কয়েক মিনিট পরে লন্ডনের সাথে সংযোগ ফিরে পেয়ে অনুষ্ঠানটি করি। তখন ভূমিকম্প হচ্ছিল, কিন্তু আমি ও আমার সাথে থাকা আলোচকেরা কেউ বুঝতে পারেন নি। অনুষ্ঠান শেষ হবার পরই ভূমিকম্পের খবর পেলাম। পদ্মাতীরের সমস্যা নিয়ে মানুষের কথা শুনতে এখানে ক্লিক করুন।

১৪ই এপ্রিল ২০১৬, বৃহস্পতিবার, গজারিয়া: মেঘনা তীরে গজারিয়া উপজেলার দুই দিকে মেঘনা এবং এক দিকে গোমতি নদী। এখানকার মানুষের বড় অংশ মাছ ধরার উপর নির্ভরশীল।

Image caption শুনছিলাম গজারিয়ার মানুষের নদীকষ্টের কথা।

বৃহস্পতিবার সকালে যখন গজারিয়ায় একটি ঘাটে যাই তখন জেলে শাহজালাল ব্যাপারীর সাথে পরিচয় হয়। তিনি জানান নিষিদ্ধ হলেও তিনি ও অন্য জেলেরা মেঘনায় ইলিশের জাটকা ধরছেন। বাংলা বর্ষবরণকে কেন্দ্র করেও জাটকা ধরার মাত্রা বেড়ে গিয়েছিল। শাহজালাল ব্যাপারী নিজেও বোঝেন যে জাটকা ধরার কারণে মেঘনায় ইলিশ সহ সব ধরণের মাছের ক্ষতি হচ্ছে। মাছ কমে যাচ্ছে। কিন্তু তাঁর বক্তব্য হচ্ছে, সংসার চালানোর জন্য জেলে যাবার ভয় উপেক্ষা করে তারা জাটকা ধরেন। তাঁর এই কথা শুনেই তাঁকে সন্ধ্যায় বিবিসি বাংলার সরাসরি অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার অনুরোধ করি। মেঘনার পশ্চিম তীর থেকে সেই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি জেলেদের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন। কারেন্ট জাল ব্যবহার এবং এই জাল তৈরি করা নিষিদ্ধ। কিন্তু এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অভিযান চললেও গোপণে দু’টি কাজই চলছে ব্যাপক ভাবে। স্থানীয় প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের কথাতেও অসহায়ত্ব প্রকাশ পায়। তারা বলেন, অভিযান চালানোর পাশাপাশি সচেতনতা সৃষ্টিরও চেষ্টা করা হচ্ছে। এর পরও জাটকা ধরা কমিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না। মেঘনার দুই তীরে সারি সারি কারখানা গড়ে উঠছে। বিভিন্ন ধরনের কারখানার বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদীতে। সেজন্য পানি দূষণের কারণেও মেঘনায় মাছ কমে যাচ্ছে। কারখানা তৈরির জন্য নদী দখল এবং অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়েও মেঘনাকে হুমকির মুখে ফেলছে। মেঘনা তীরের মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে। এসবই উঠে এসেছে বিবিসি বাংলার সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে। একটি চরের ইউনিয়ন পরিষদের একজন মেম্বার মনিজা বেগম এবং চরের স্কুল শিক্ষক আমেনা আক্তার বিবিসির অনুষ্ঠানে এসব ইস্যুতে কথা বলতে ভয় পাচ্ছিলেন। প্রভাবশালীদের নজর তাঁদের উপর পড়বে কিনা সেই ভয় কাজ করছিল। নদী রক্ষায় আন্দোলনকারী মজিবুর রহমানকে রাজি করাতে কোন বেগ পেতে হয়নি। শেষ পর্যন্ত তারা সকলেই বিবিসির অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে খোলামেলা ভাবে তাঁদের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন। তাদের কথা শুনতে এখানে ক্লিক করুন।