মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পাঁচ বছরে কতটা সফল মমতা ব্যানার্জি?

mamata_banerjee_trinamool_congress ছবির কপিরাইট Getty
Image caption দুর্নীতির নানা অভিযোগের বিরুদ্ধে মমতা ব্যানার্জির অস্ত্র তার কাজের খতিয়ান

সাড়ে তিন দশকের বামপন্থী শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ঠিক পাঁচ বছর আগে ক্ষমতায় এসেছিলেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি।

কিন্তু বিরোধী নেত্রী হিসেবে তিনি যতটা সফল ছিলেন, মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকাতেও কি তাকে ততটাই সফল বলা যাবে?

গত পাঁচ বছরে তার দলের বিরুদ্ধে অজস্র আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, তার আঁচ কি মুখ্যমন্ত্রীর গায়েও লাগেনি?

সবচেয়ে বড় কথা – রাজ্যে তার বিপুল জনপ্রিয়তা ও আবেদন কি এখনও অটুট?

পশ্চিমবঙ্গে ১৯মে-র ভোট গণনাতেই নির্ধারিত হয়েছে মমতা ব্যানার্জির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ - তার আগে দেখতে বেরিয়েছিলাম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তার পাঁচ বছরের কাজকর্মকে কে কীভাবে দেখছেন।

কালীঘাটে মমতা ব্যানার্জির পাড়ায়

‘‘রাজ্য চালান দিদিমণি, সবই উনি জানেন ... চোখে উনি দেখেন না তো, কানে উনি দেখেন! ’’

কলকাতার কালীঘাট এলাকায় একটি নিম্ন মধ্যবিত্ত পাড়া – হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রীটে ঢোকার মুখে দিদিমণি, অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে ব্যঙ্গ করে মাইকে তারস্বরে ভোটের গান বাজছিল।

Image caption মুখ্যমন্ত্রীর সমর্থনে তার এলাকায় বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ড

একেবারে সাদামাটা এই রাস্তাটাই কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর ঠিকানা – কোনও সরকারি বাসভবনে নয়, এখানেই টালির ছাদওলা পৈতৃক বাড়িতেই এখনও থাকেন তিনি।

সেই একতলা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়েও কানে আসছিল সেই গান, ‘‘দলের লোকের জন্য ওনার ভীষণ উদারনীতি, নিজের লোকের মহাপাপও নয় কোনও দুর্নীতি! ’’

মুখ্যমন্ত্রীর গলিতে ঢোকার মুখে তাকে নিয়ে এই গান কিছুদিন আগেও অকল্পনীয় ছিল – কিন্তু দলের নেতা-মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতির অভিযোগ যে মমতা ব্যানার্জির ভাবমূর্তিকেও রেহাই দেয়নি, এটা তারই প্রমাণ।

এলাকার লোকজন অবশ্য দেখা গেল এখনও তাদের ‘পাড়ার মেয়ে’র পাশেই আছে। হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রীটের চায়ের দোকানে প্রায় সবাই একবাক্যে বললেন ‘‘পাড়ার মেয়ে সবার বিপদে-আপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে, এমন কী মুখ্যমন্ত্রীর নিজের ভাইরাও এলাকার সবার জন্য জান-প্রাণ দিয়ে করে’’।

কিন্তু গলির একটু ভেতরে ঢুকলেই আজকাল অন্য রকম সুরও শোনা যায়। সারদা চিট ফান্ড কিংবা নারদ স্টিং কেলেঙ্কারিতে দলের নেতারা অবাধে লুঠপাট করেছেন মমতা ব্যানার্জির প্রশ্রয়েই, এটা অনেকেই বিশ্বাস করেন।

এমনই এক যুবক তো সরাসরি প্রশ্ন তুললেন, ‘‘কাজের চেয়ে তো বেশি দুর্নীতিই হয়েছে। সততার প্রতীক বলে সারা শহরে যে মুখ্যমন্ত্রীর পোস্টার আর ব্যানার পড়ত, সেগুলো সব গেল কই? না কি এখন সারদা-নারদার প্রতীক জুড়তে হবে তার সঙ্গে? ’’

Image caption মমতা ব্যানার্জির পাড়ায় তার বাড়ির কাছে নির্বাচনী প্রচারের একটি গাড়ি

মুখ্যমন্ত্রিত্বের পাঁচ বছরের শেষে এসে এই দুর্নীতির অভিযোগই কিন্তু তাকে সবচেয়ে বিপর্যস্ত করেছে। সাদামাটা জীবনযাপন আর নীল-সাদা হাওয়াই চটি এতদিন যার সততার ট্রেডমার্ক ছিল, তার নিজের গলাতেও এখন অভিমান আর উৎকন্ঠা।

ভোটের সময় একের পর এক জনসভায় তিনি বলেছেন, ‘‘ভুল করলে আমায় চড় মারবেন, কিছু মনে করব না। বললে বাড়িতে গিয়ে বাসনও মেজে দিয়ে আসব। কিন্তু দয়া করে চোর বলবেন না, মিথ্যে বদনাম দেবেন না! ’’

প্রশাসক মমতা, বিরোধী নেত্রী মমতা

তবে শুধু দুর্নীতি নয়, রাজ্যের প্রশাসক হিসেবে তিনি শিল্প টানতেও চরম ব্যর্থ বলে অভিযোগ করছে বিরোধী সিপিএম।

দলের তরুণ এমপি ঋতব্রত ব্যানার্জি মনে করেন, বড় লগ্নি একটাও আসেনি – মুখ্যমন্ত্রী শুধু ধূপকাঠি বা তেলেভাজা শিল্পকে উৎসাহ দিয়ে গেছেন।

Image caption সিপিএম এমপি ঋতব্রত ব্যানার্জির দাবি, মুখ্যমন্ত্রী কোথায় কাকে চাকরি দিয়েছেন সে হিসেব দিন

তার কথায়, ‘‘উনি যে এই দফায় ৬৮ লক্ষ চাকরি দিয়েছেন বলছেন, তাহলে তো রাজ্যের প্রতি বুথে ৮৮ থেকে ৯০টা চাকরি হওয়ার কথা। কিন্তু কই, আমরা তো একটাও দেখছি না – তাই উনি কাকে কোথায় চাকরি দিয়েছেন সেই হিসেবটা দিলে ভাল হয়।’’

আসলে রাজপথে সফল আন্দোলনের যে ট্র্যাডিশন মমতা ব্যানার্জিকে বিরোধী নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল – ক্ষমতায় আসার পর সেটাই তাকে প্রশাসক হিসেবে ডুবিয়েছে বলে মনে করেন প্রবীণ বামপন্থী নেতা শ্যামল চক্রবর্তী।

মি চক্রবর্তী বলছিলেন, ‘‘সাহিত্যিক সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে। সেটাকেই একটু ঘুরিয়ে নিয়ে বলতে চাই বন্যেরা বনে সুন্দর আর মমতা ব্যানার্জি বিরোধী দলে! ’’

কিন্তু এটাও তো ঠিক, মুখ্যমন্ত্রিত্বের পাঁচ বছরে রাজ্যের সব নির্বাচন হাসতে হাসতে জিতেছেন মমতা ব্যানার্জি।

তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বুদ্ধিজীবী ও কবি সুবোধ সরকারের মতে সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার যে অসাধারণ ‘কানেক্ট’ – সেটাই কিন্তু তাকে এই বিপুল জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে।

‘‘সমাজের দরিদ্রতম অংশের সঙ্গে তিনি যেভাবে মিশতে পারেন, তাদের উঠোনে বসে তাদের ভাষায় যেভাবে কথা বলতে পারেন সেটাই তাকে মানুষের এত আপন করে তুলেছে। মনে রাখবেন চৌত্রিশ বছরে কমিউনিস্টদের সঙ্গে মানুষের কিন্তু বিরাট দূরত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছিল’’, বলছিলেন সুবোধ সরকার।

Image caption কবি সুবোধ সরকারের মতে, গরিবের সঙ্গে ‘গরিবের মতো’ মিশতে পারেন মমতা ব্যানার্জি

তিনি আরও যোগ করছেন, ‘‘গরিবের সঙ্গে এই যে গরিবের স্তরে নেমে এসে মেশা – তা আমাদের শহুরে চোখে অদ্ভুত লাগতে পারে। মনে হতে পারে এমন আবার সম্ভব না কি? এটা নিয়ে হাসাহাসিও কম হয়নি – কিন্তু আমার মতে এটাই মমতা ব্যানার্জির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য! ’’

ফলে মমতা ব্যানার্জি কোনও সরল, একমাত্রিক কোনও রাজনীতিক নন – যাকে খুব সহজে ব্যাখ্যা করা যায়।

একচ্ছত্র ক্ষমতার কেন্দ্র?

কংগ্রেস নেতা ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ওমপ্রকাশ মিশ্র কিন্তু মনে করেন সংসদীয় রাজনীতির গরিমা তিনি রাখতে পারেননি।

ড: মিশ্র বলছিলেন, ‘‘তার ক্রিস্ট্যালাইজেশন, অঙ্গভঙ্গী বা ভাষাজ্ঞান নিয়ে আমি কিছু বলব না। কিন্তু যেটা আমি বলতে বাধ্য তা হল সব ক্ষমতাকে উনি কেন্দ্রীভূত করতে চাইছেন। এমন কী বলছেন, সব কেন্দ্রে উনিই না কি প্রার্থী – বাকিরা কেউ কিছু নন। ফলে সংসদীয় গণতন্ত্রকেও তাঁর দল সম্মান জানাচ্ছে না।’’

তৃণমূল কংগ্রেসে ‘একটাই পোস্ট, বাকি সব ল্যাম্পপোস্ট’ এই কথাটাকে সার্থক করার জন্য মমতা ব্যানার্জি নিজেই প্রাণপাত করে যাচ্ছেন বলে রাজ্যের এই প্রবীণ রাজনীতিকের অভিমত।

Image caption ভবানীপুরে মুখ্যমন্ত্রীর চ্যালেঞ্জার চন্দ্র বোস বলছেন পাঁচ বছরে কোনও প্রতিশ্রুতি রাখেননি মমতা ব্যানার্জি

ভবানীপুরে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে যিনি লড়ছেন, সেই বিজেপি নেতা চন্দ্র বোস আবার তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনছেন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার।

তিনি বলছিলেন, ‘‘মানুষ মমতা ব্যানার্জিকে একটা সুযোগ দিতে চেয়েছিলেন – তিনি তা পেয়েওছিলেন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে তার অবদান শুধু বামপন্থীদের ক্ষমতা থেকে হঠানোতেই সীমিত থেকে গেছে।’’

‘‘উনি যে সব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন – শিল্প নিয়ে আসবেন, আইন-শৃঙ্খলার উন্নতি ঘটাবেন, মহিলাদের সুরক্ষা-মর্যাদা দেবেন, স্যাটেলাইট টাউনশিপ গড়ে উঠবে তার একটিও কিন্তু তিনি গত পাঁচ বছরে রাখতে পারেননি’’, বলছেন চন্দ্র বোস।

এই সব অভিযোগই হয়তো কিছুটা সত্যি। আবার মমতা ব্যানার্জির জনপ্রিয়তাও যে বিপুল, ভুল নেই তাতেও।

পাঁচ বছর আগে যে মমতা ব্যানার্জি বামপন্থীদের সাড়ে তিন দশকের শাসকের অবসান ঘটিয়েছিলেন – তিনি আর ২০১৬র মমতা নিশ্চয় এক নন, তার নানা কাজকর্ম নিয়ে এখন বহু প্রশ্ন – তবু আজও পশ্চিমবঙ্গে তিনিই মুখ্যমন্ত্রিত্বের প্রধান দাবিদার।

চিঠিপত্র: সম্পাদকের উত্তর