বাংলাদেশে ধর্ম নিয়ে অসহিষ্ণুতা বেড়েই চলেছে

Image caption নারায়ণগঞ্জের একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত ইসলাম ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হামলার শিকার এবং লাঞ্ছিত হয়েছেন

বাংলাদেশে ইদানীংকালে বিভিন্ন হত্যা এবং আক্রমণের পর ধর্মের বিষয়টিকে সামনে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও দেখা যাচ্ছে ধর্মকে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা হচ্ছে।

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত ইসলাম ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হামলার শিকার এবং লাঞ্ছিত হয়েছেন।

গ্রামের লোকজন বলছেন মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে তার বিরুদ্ধে জনগণকে খেপিয়ে তোলা হয়। একজন বলছিলেন, “আমরা কয়েকজন যদি সামাল না দিতাম এই স্কুল ভাইঙ্গা তছনছ কইরা ফালাইতো”।

ওইদিন স্কুলে উপস্থিত সাহাবুদ্দীন নামে মধ্যবয়সী একজন বলেন, ইসলামের অবমাননার কথা প্রচারের কারণেই শ্যামল কান্তির বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণকে বিক্ষুব্ধ করা সহজ হয়। “আমরা বলি যে তোমরা উত্তেজিত হইয়োনা থাম থাম, সবাই আমাদেরকে বলে তুমি কি মুসলমান? ইসলাম ধর্মের ওপর এতবড় কথা বলছে... তুমি সরো সরো” ।

বাংলাদেশে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়িয়ে অন্যতম বড় হামলার ঘটনা ঘটে ২০১২ সালে রামুতে। ফেসবুকে কোরান শরীফ অবমাননার অভিযোগ এনে কক্সবাজারের রামুতে বেশ কয়েকটি বৌদ্ধ মন্দিরও বসতিতে আগুন দেয়া হয়।

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বলেন, ধর্মীয় অবমাননার কথা বলে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে এরকম হামলা বিভিন্ন সময় হচ্ছে। ২০১১ সাল থেকে এরকম কয়েকটি মিথ্যা গুজব ছড়ানোর ঘটনা তাদের নজরে এসেছে এবং এ নিয়ে সরকারের কাছে বিচারও দাবি করেছেন তারা।

Image caption বাংলা ভাষায় কিছু ব্লগ এবং ওয়েবে ইসলাম ধর্মকে নিয়ে বিতর্কিত লেখালেখিও দেখা যায়

তিনি বলেন, “আজকে এই যে ঘটনাগুলো পর্যায়ক্রমিকভাবে চলছে, হয়রানি চলছে, কারো বিরুদ্ধে কোনো রকমের দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। এই যদি চলতে থাকে মানসম্পন্ন যে ব্যক্তিরা আছেন জ্ঞানীগুণী লোকরা আছেন তারা কেন দেশে থাকবেন”।

মিস্টার দাশগুপ্ত বলেন, সব রাজনৈতিক দলই ধর্মকে ব্যবহার করছে।

অন্যদিকে বাংলা ভাষায় কিছু ব্লগ এবং ওয়েবে ইসলাম ধর্মকে নিয়ে বিতর্কিত লেখালেখিও দেখা যায়।

ফেসবুকে মুসলমানদের গালিগালাজ করে অনেক মন্তব্য চোখে পড়ে কিছু ক্ষেত্রে। ধর্ম অবমাননা আর এসব লেখালেখি এবং মন্তব্য বিদ্বেষ ছড়ায় বলে মনে করেন ইসলামপন্থীরা।

ইসলামি ঐক্যজোটের মহাসচিব ফেইসবুকের এরকম পোস্ট এবং এসব ব্লগের ধর্মের কটূক্তির কথা উল্লেখ করে বলেন, “প্রতিবাদ তো করতেই হবে। অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষ আপনি আপনার ধর্ম পালন করেন এর স্বাধীনতা আপনার আছে। মুসলমান অত্যন্ত সহনশীল। আপনি আমার ধর্মের ওপর আঘাত করতে যাবেন কোন অধিকারে”।

রাজনীতিতে ধর্ম ব্যবহারের প্রশ্নে তিনি বলেন, ধর্মকে ব্যবহার নয় ইসলামের বিধান মেনেই তারা ধর্মীয় রাজনীতি করেন।

ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ কিংবা এসব ঘটনার পক্ষে বিপক্ষে বেশিরভাগ প্রচার দেখা যায় ফেসবুকে।

Image caption ধর্মীয় অবমাননার কথা বলে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় হামলার ঘটনা ঘটছে, বলছেন রানা দাশগুপ্ত

যোগাযোগ বিশ্লেষক শামীম রেজা বলছিলেন ফেসবুক এসব প্রচার প্রকাশের বিষয়টি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

ফেসবুকে বিভিন্ন মন্তব্য বক্তব্য নিয়ে তিনি বলেন, “আমি যদি ফেসবুক ব্যবহারকারীদের একেবারে নিষ্ক্রিয় দর্শক হিসেবেও ধরি যে তারা পর্যবেক্ষক মাত্র, তাদের মতামতটাও গুরুত্বপূর্ণ যে তারা এই ঘটনাগুলোকে কিভাবে দেখছেন। তো সবকিছু দেখে কিন্তু আমার কাছে মনে হয়না যে সহিষ্ণুতার মাত্রা উন্নতির দিকে বরং সহিষ্ণুতার মাত্রা অবনতির দিকে। সেটা সামাজিক বিচারে সেটা রাজনৈতিক বিচারে আর ধর্মীয় বিচারে তো বটেই”।

এদিকে নারায়ণগঞ্জের ঘটনা তদন্ত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার সত্যতা পায়নি।

ধর্ম নিয়ে এরকম বাড়াবাড়ির এবং রাজনীতির অবসান চান আক্রান্ত শ্যামল কান্তি ভক্ত।

তিনি বলেন, “রাষ্ট্রনায়করা বলেন বা সরকার বলেন এই বিষয়টাতে হস্তক্ষেপ করা দরকার বলে আমার মনে হয়। ধর্মের বিষয়টাতে কেউ যেন প্রাধান্য না দেয় বা কেউ কোনো উসকানি না দেয় বা কেউ কোনো এটাকে ব্যবহার করে। ইদানীং আমি যেটা বুঝি যে ধর্ম নিয়ে রাজনীতিটা বেশি হচ্ছে ধর্ম কে ব্যবহার করে রাজনীতি চলছে”।

চিঠিপত্র: সম্পাদকের উত্তর