কল্পনা চাকমা অপহরণ মামলা: ২০ বছরেও সুরাহা হয়নি

ispr_response_on_kalpana_chakma_dissapearance
Image caption আইএসপিআরের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে পাঠানো এসএমএস

বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি নারী সংগঠনের নেত্রী কল্পনা চাকমা রহস্যজনক অন্তর্ধানের আজ ২০ বছর পুরো হচ্ছে। তার পরিবার সেনাবাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে তাকে অপহরণের অভিযোগ এনে মামলা করেছিলেন - কিন্তু ২০ বছর পার হলেও এখনো সেই মামলার কোন সুরাহা হয়নি।

সেনাবাহিনী বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তাদের বক্তব্য, পাহাড়িদের কয়েকটি সংগঠনের অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণেই ওই ঘটনা ঘটেছিল।

ঘটনার সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের হিল উইমেনস ফেডারেশনের অর্গানাইজিং সেক্রেটারি ছিলেন কল্পনা চাকমা। তার পরিবার বলছে, ১৯৯৬ সালের এই দিনে গভীর রাতে রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে নিজের বাড়ি থেকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো কল্পনা চাকমাকে। এর পর থেকে তার আর কোন খোঁজ মেলেনি।

তার পরিবারের সদস্যরা বলেন, ২০ বছর পরও এই ঘটনার বিচার না পাওয়ায় তারা অসহায় বোধ করছেন। কল্পনা চাকমার ভাই কালিন্দী কুমার চাকমা বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “বিশ বছর হয়ে গেলো। আরো কত বছর যে লাগবে আমরা বুঝতে পারছি না।”

ঘটনার পর পরিবারের পক্ষ থেকে যে মামলা করা হয়েছিলো তার তদন্ত হয়েছে অনেকবার। তিন সদস্যের একটি কমিটি, পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ, সিআইডি সহ এমন কয়েক দফায় তদন্ত হয়েছে।

কিন্তু শুরু থেকেই পরিবারের অভিযোগ, এই ঘটনার তদন্ত কখনোই সঠিকভাবে হয়নি।

ছবির কপিরাইট unk
Image caption কল্পনা চাকমা। ফাইল ছবি

কালিন্দী চাকমা বলছেন সে কারণেই তিনি সিআইডির করা সর্বশেষ তদন্তে নারাজি আবেদন করেছেন। তিনি বলছেন, “আমরা তদন্ত মেনে নেইনি, কারণ সিআইডিকে আমরা সব তথ্য পরিষ্কার ভাবে বলেছিলাম। সেই ঘটনার সাথে একজন সেনা আর সহযোগী বিজিবির দুই সদস্য ছিলো যারা ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষ জড়িত।"

"কিন্তু সিআইডির রিপোর্টে বলা হয়েছে, ঘটনা সত্য - কিন্তু কে বা কারা করেছে সেটি অস্পষ্ট তাই কল্পনা চাকমাকে উদ্ধার করা সম্ভব হলো না”- বলেন তিনি।

কল্পনা চাকমা অপহরণের ঘটনা বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে অন্যতম চাঞ্চল্যকর ও স্পর্শকাতর একটি ঘটনা। মানবাধিকার কর্মী আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নুর খান লিটন বলছেন, সেনাবাহিনীর একজন সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের কারণে এর বিচারে কালক্ষেপণ করা হচ্ছে।

তিনি বলছেন, “বাংলাদেশে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি দেখেছি, বিশেষ করে এ ঘটনায়, তার পরিবার বা যারা প্রত্যক্ষদর্শী তাদের দাবি অনুযায়ী সেনা বাহিনীর একজন সদস্য ও বিজিবির দুজনের সংশ্লিষ্টতার কথা জানা যায়। এবং মামলাতেও তাদের কথা এসেছে। এবং বারবার এই কারণে আমরা দেখেছি তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হচ্ছে এবং নানাবিধ কারণে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে।”

তিনি আরো বলছেন, “আমাদেরকে আর একটু খেয়াল করতে হবে সেটা হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামে কিন্তু সেনাবাহিনী এক ধরনের ইমপিউনিটির সুযোগ বিভিন্নভাবে পেয়েছে বিগত দিনে। সেই সমস্ত বিষয়গুলো মিলে এই সেনসেশনাল মামলা হওয়ার কারণে আমার মনে হচ্ছে যে এই সময় ক্ষেপণটা হচ্ছে।”

ছবির কপিরাইট facebook
Image caption কল্পনা চাকমার অপহরণের ঘটনায় বহু প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হয়েছে

আদালতের আদেশ অনুযায়ী বর্তমানে ঘটনাটির পুন:তদন্ত করছেন স্থানীয় পুলিশ সুপার সাঈদ তারিকুল হাসান। তিনি বলছেন, আদালত থেকে কিছু নির্দেশনা দিয়ে দেয়া হয়েছে অধিকতর তদন্তের জন্য। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী যে সকল সাক্ষ্য গ্রহণ বাকি ছিলো, তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। ঘটনাস্থল সহ পারিপার্শ্বিক অবস্থা সেগুলি মামলার অধিকতর তুলে ধরা হয়েছে।”

সেনা বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ পুলিশের পক্ষে কঠিন কিনা সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “তিনি বলছেন মামলার তদন্তটা কঠিন না কিন্তু ঘটনা যেহেতু অনেক আগের এবং এলাকাটি দুর্গম হওয়ার কারণে দীর্ঘদিন পরে সেসময়কার সকলের যোগাযোগ করে ওঠা দুরূহ হয়ে যায়। সেসময় আমাদের কমিউনিকেশন বা টেকনোলজি অতটা উন্নত ছিলো না ফলে ঐ সময় হয়ত অনেক কিছু পাওয়া যায়নি। ২০ বছর পর এতদিন পরে এসে মামলার তদন্ত একটু ডিফিকাল্ট”

কল্পনা চাকমা অপহরণের জন্য সেনাবাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে তার পরিবারের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছিলো আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশিদুল হাসানের কাছে।

মোবাইল ফোনে একটি এসএমএস বার্তার মাধ্যমে তিনি জানিয়েছেন, সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ সঠিক নয়। এ বিষয়ে বেশ ক'টি তদন্ত হয়েছে যাতে সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে তিনি বলছেন।

ঐ বার্তায় আরো বলা হয়, "তদন্তে পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়িদের সংগঠন জনসংহতি সমিতির সদস্যদের অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে।"

এ সম্পর্কে জনসংহতি সমিতির সদস্যদের মন্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

চিঠিপত্র: সম্পাদকের উত্তর