বাংলাদেশে দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে 'ডিজিটাল গান'

Image caption এখানেই একসময় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল দুটো সিডির দোকান। এখন ক্রেতার অভাবে একটি বন্ধ হয়ে সেখানে পোশাকের ব্যবসা চলছে।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গান শোনার মাধ্যমে চলে এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। অনেকেই একে বলছেন ‘ডিজিটাল গানের যুগ’।

একটা সময় ক্যাসেট প্লেয়ারে গান শোনার বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। মূলত নব্বইয়ের দশক থেকে এই শতকের শুরু পর্যন্ত ক্যাসেটে গানের অ্যালবাম প্রকাশ করা হতো।

এরপর সিডি প্লেয়ারে গান শোনা শুরু হলে দ্রুত হারিয়ে যায় ‘ক্যাসেট যুগ’।

কিন্তু বর্তমানে এই সবকিছুকে ছাড়িয়ে জায়গা করে নিয়েছে অনলাইনে গানের প্রকাশনা।

ইউটিউব, ফেসবুকের মাধ্যমে শ্রোতারা যেকোনো সময় যেকোনো স্থান থেকে উপভোগ করতে পারছেন সেইসব গান। সেইসাথে বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন্সের কারণে বদলে যাচ্ছে শ্রোতাদের গান শোনার অভ্যাস।

এর মধ্যে গ্রামীণফোনের জিপি মিউজিক, রবির ইয়ন্ডার মিউজিক -এর কথা বেশি উল্লেখ করলেন অনেক শ্রোতারা।

Image caption প্রায় সব বাড়িতেই আগে এরকম ক্যাসেট দেখা গেলেও, এখন আর তা খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

ঢাকার শাহবাগের একটি সিডির দোকানে গিয়ে দেখা গেল চড়া ভলিউমে গান বাজছে। কিন্তু দোকানে কোনও ক্রেতা নেই।

বিক্রয় কর্মী সুশীল বলছিলেন, “বিক্রি ভাল না। ইউটিউবে মোবাইলে অনলাইনে সব চলে গেছে। দিনে ২০/৩০টা বিক্রি হয়। তিন চার বছর আগে দেড়-দুশো সিডি বিক্রি হতো”।

সুরের মেলা নামের এই দোকানটির ঠিক উল্টো-পাশেই ছিল আরেকটি সিডির দোকান। সেটি বন্ধ হয়ে গিয়ে এখন সেখানে ছেলেদের পোশাকের দোকান।

এখানকার একজন কর্মী মোঃ মাসুদ জানান, ভিসিএল সিডি কর্নার নামে সেই দোকানটি ১৫ বছর চলার পর এবছরের পহেলা বৈশাখে বন্ধ হয়ে গেছে।

তিনি জানান, “দোকানটি চালানো সম্ভব হচ্ছিল না কারণ সিডি কিনে গান শোনার অভ্যাস দিনকে দিন হারিয়ে যাচ্ছে”।

বেশ কয়েকটি সিডির দোকান ঘুরে দেখা গেল সেগুলোতে আসলেই ক্রেতা খুব একটা আসছে না।

দুয়েকজন আসছেন কোনও ভিনদেশী সিনেমার সিডি বা ডিভিডি কিনতে।

তাহলে কিভাবে গান শুনছেন এই সময়ের মানুষেরা?

Image caption ক্যাসেট যুগ শেষ হলে আসে সিডি। আর এখন সে সময়ও নেই কারও। অনেকেই এখন গান শুনতে চাইছে অনলাইনে কিংবা মোবাইল অ্যাপসে।

জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী ফাহমিদা নবী বলছিলেন, “ এই মিউজিকও কিন্তু একধরনের রূপান্তর। আগে মানুষ লং প্লেতে গান শুনতো।

তারপর আসলো ক্যাসেট। এরপর সিডি প্লেয়ার। আর এখন মানুষের এখন সময় নেই।

মানুষ এখন অনলাইনে, ফেসবুক ইউটিউবে গান শোনে তার মানে বলবো না গান শোনা কমে গেছে”।

এবারের ঈদকে সামরে রেখেই বাজারে এলো তার নতুন গানের অ্যালবাম। জি সিরিজের ব্যানারে এই অ্যালবামটি এসেছে।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সঙ্গীত বিষয়ক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জি সিরিজ। গীতাঞ্জলী নামে তাদের রয়েছে সিডি বিক্রির দোকান।

জি সিরিজ বাংলাদেশে অসংখ্য গানের অ্যালবাম নিয়ে এসেছে।

এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও বাংলাদেশ মিউজিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নাজমুল হক ভূঁইয়া খালেদ বলছিলেন, “এখন আমাদেরও এর সাথে তাল মেলাতে হচ্ছে। পুরো ইন্ডাস্ট্রিকে এখন থার্ড পার্টির মাধ্যমে কাজ করতে হচ্ছে। আমাদের হাতে নিয়ন্ত্রণটা নেই যেটা সিডি ক্যাসেটে আমাদের হাতে ছিল। জি-সিরিজ থেকে অবশ্য সরাসরি গুগলের সাথে, মোবাইল কোম্পানির সাথে কাজ করছি”।

তিনি জানান, এখন তাদের মূল আয় হয় ডিজিটাল এসব মাধ্যম থেকেই।

Image caption অনেক দোকানে ক্রেতারা আসেন বেশিরভাগই বিভিন্ন ভিডিও সিডি কিনতে।

এখন এমন অনেক শিল্পী আছেন যারা পুরো অ্যালবামই অনলাইনে রিলিজ করছেন । আনুশেহ আনাদিল তার একক অ্যালবাম রিলিজ করেছিলেন অনলাইনে।

এ প্রজন্মের একজন শিল্পী জন কবিরও তার সর্বশেষ অ্যালবাম অনলাইনে রিলিজ করেন।

আরও অনেক শিল্পী এখন মিউজিক ভিডিও তৈরি করে ইউটিউব কিংবা ফেসবুকে আপলোড করছেন। লক্ষ লক্ষ মানুষ সেখান থেকেই গানটি উপভোগ করছেন।

মিউজিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের বর্তমান কমিটির সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলছিলেন সিডির যুগ আর নেই।

গান এখন বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে। তিনি বলেন, আগে মাধ্যম একটাই ছিল। তখন লক্ষ লক্ষ সিডি বিক্রি হয়েছে।

“২০০৮ এর আস্তে আস্তে ধ্বস নামলো। আগে একটা সিডি ২০ হাজার ৩০ হাজার করতাম। এখন ২০০ কপি করলেও সেটা চলা মুশকিল হয়ে যায়।

এখন যা সিডি করা হয় তা শুধু প্রদর্শন আর প্রকাশনা উৎসবে দেখানো হবে সেজন্য”।

তবে ডিজিটাল মাধ্যমকে ভর করে মাঝখানে বাজারে যে ধ্বস নেমেছিল সে অবস্থা এখন তারা কাটিয়ে উঠেছেন জানান মিস্টার হোসেন।

“ মনে করুন বার্ষিক ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা বেচাকেনা হতো আগে। পাঁচবছর আগে এটা নেমে এসেছিল শূন্যে। কিন্তু এখন গুগল থেকে আমরা ভালই টাকা পাচ্ছি। মোবাইল ফোনগুলোর কাছ থেকেও পাচ্ছি”।

Image caption ক্যাসেট প্লেয়ারে গান শোনার যুগ শেষ হয়েছিল সিডি আসার পর। আর এখন গান দিন দিন হয়ে উঠছে অনলাইন কেন্দ্রীক।

তার প্রতিষ্ঠান অনুপম রেকর্ডিং স্টুডিও সিনেমার গানসহ বিভিন্ন ধরনের অ্যালবাম প্রকাশ করে আসছে ৩০ বছর ধরে।

কিন্তু এবছর ঈদকে সামনে রেখে কোনও সিডিই প্রকাশ করছেন না তারা। তাদের যে ৭০০ গানের সংগহ্র আছে সেগুলোকে ডিজিটালাইজড করার অর্থাৎ অনলাইনে তোলার কাজ নিয়েই তারা ব্যস্ত।

মিউজিক কোম্পানিগুলোর মালিকদের সংগঠন এমআইডির সদস্য সংখ্যা কয়েক বছর আগেও ছিল একশো সত্তরেরর বেশি। তা বর্তমানে ৮৬তে নেমে এসেছে।

এখন যারা টিকে আছে তারা টেলিকম কোম্পানিগুলোর মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে গান কিংবা অনলাইন যেকোনো মাধ্যমে গান বিক্রি করে ঘুরে দাড়াতে চাইছে।

মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকে একটা প্রতিবার ডাউনলোড করলে টাকা পাচ্ছে মিউজিক কোম্পানিগুলো।

মিস্টার আনোয়ার হোসেন বলেছেন, ২০০৫ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি কালো অধ্যায় পার করেছে। এখন মিউজিক কোম্পানিগুলো ডিজিটাল মাধ্যমে এসেছে নিজেদের অস্তিত্ব ধরে রাখতে।

অনলাইন থেকে গান শুনতে চাইলে অনলাইন থেকে ডাউনলোড করে শুনতে হবে । কোনও কোনও ক্ষেত্রে বিনে পয়সাতে এসব গান পাওয়া যায়। এর বাইরে বিভিন্ন মোবাইল ফোনের মিউজিক অ্যাপস তো আছেই।

অনলাইনে গান তোলার জন্য এখন কনটেন্ট প্রভাইডাররাও মাঠে নেমে গেছেন।

কাইনেটিক মিউজিক এমনই একটি প্রতিষ্ঠান যারা বিভিন্ন শিল্পীদের গান অনলাইনে তোলার কাজটি করছেন।

Image caption শিল্পীরা এখন সিডি বের করেন সংগ্রহে রাখার জন্য না হয় সৌজন্য কপি দেযার জন্য; বিক্রীর জন্য নয় মোটেই।

এই প্রতিষ্ঠানের জামশেদ চৌধুরী বলছিলেন জনপ্রিয় এবং নতুন দুই কাতারের শিল্পীরাই তাদের মাধ্যমে অনলাইনে গান ছড়িয়ে দিতে চাইছেন।

“নামকরা আর্টিস্টদের মধ্যে মাইলস, শিরোনামহীন, আসিফ আকবর, পড়শি, ইমরান, নেমেসিস আর্টসেল রয়েছে। অনেকের টোটাল রিলিজ আবার অনেকের একটা-দুটা গান নিয়ে আমরা কাজ করছি”।

শিল্পী ফাহমীদা নবী মনে করেন, এসব মাধ্যমে গান শোনার মধ্য দিয়ে গান ফ্রি হয়ে গেছে। ফলে লাভ হচ্ছে না শিল্পীদের।

তিনি বলেন, “ শিল্পীর এখানে কিছুই হচ্ছে না। শিল্পী দুস্থ শিল্পীর খাতায় নাম লেখাচ্ছে। এই যে ডাউনলোড করছে যারা যারা এই কাজরে সাথে জড়িত তারাই লাভ করছে। শিল্পীর কোনও লাভ নাই। শিল্পী কিছু পায় না”।

এক বিকেলে বেশ কটি সিডির দোকানে ঘুরছিলাম কোনও একজন ক্রেতার সঙ্গে কথা বলবো বলে।

তবে বেশ অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও অন্যান্য দোকানে ক্রেতাদের আনাগোনা চোখে পড়লেও আমাকে হতাশ হয়েই ফিরে আসতে হল।

হয়তো আমার ফিরে আসার পরই কোনও ক্রেতা আসবেন। সেই আশায় বসে তাকা দোকানিকে পেছনে রেখে ফিরে এলাম।

ধীরে ধীরে বাংলাদেশের মানুষ এই দিকেই ঝুঁকছে বলে জানাচ্ছেন মিউজিক কোম্পানির মালিকরা।

চিঠিপত্র: সম্পাদকের উত্তর