http://www.bbcbengali.com

12 জুলাই, 2005 - প্রকাশের সময় 16:21 GMT

দূরের ধূমকেতুর ওপর পরীক্ষামূলক আঘাত

পৃথিবী থেকে আট কোটি ৩০ লক্ষ মাইল দূরের একটি ধূমকেতু কমেট টেম্পল ওয়ানের ওপর মানুষের তৈরী একটি মহাকাশযান উদ্দেশ্যমূলকভাবে আঘাত করেছে।

মার্কিন মহাকাশ গবেষনা সংস্থা নাসার ডীপ ইমপ্যাক্ট মহাকাশযান থেকে পাঠানো ৩৭০ কিলোগ্র্যাম ওজনের ছোটখাটো একটি ফ্রিজ্বের আকারের নভোখেয়া গত সপ্তাহে পরিকল্পনামাফিক আছড়ে পড়েছে ধূমকেতুর ওপর। এই আঘাতে সেখানে সেখানে আলোর প্রচন্ড দ্যুতির সৃষ্টি হয়।

এই প্রকল্পের পরিচালক রিক গ্র্যামিয়ের বলেন, ‘‘এটা একবারে সাংঘাতিক একটা ঘটনা। ধূমকেতুতে গর্ত সৃষ্টি হবার সময় সেখান থেকে আবর্জনা বের হবার পর তাতে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে অগ্নিচ্ছটার মতন মনে হচ্ছিলো। ঠিক এমনটাই আমরা আশা করেছিলাম।‘‘

বিজ্ঞানীরা আশা করছেন এই সংঘর্ষের সময় ঠিক কি ঘটেছে, ফটো থেকে তা বিশ্লেষন করার মাধ্যমে তারা এই ধূমকেতুর গঠন সম্পর্কে জানতে পারবেন।

এছাড়া নভোযানের সংঘর্ষে ধূমকেতুর গায়ে যে গর্ত সৃষ্টি হয়েছে তা বিশ্লেষন করে তারা জানতে পারবেন কতটা শক্ত পদার্থ দিয়ে কমেট টেম্পল ওয়ানের উপরিভাগ গঠিত।

এ পর্যন্ত যেসব ফটো পাওয়া গেছে তা দেখে দারুন উৎসাহীত হয়েছেন ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের মহাকাশ গবেষনা প্রতিষ্ঠান, মুলার্ডস সায়েন্স ল্যাবরেটরীর বিজ্ঞানী ড. আন্ড্রু কোটস৻ তিনি বলেন, ধুমকেতুর এমন পরিষ্কার ছবি এর আগে আর দেখা যায় নি‘। যে মহাকাশযান থেকে ধূমকেতুর গায়ে আছড়ে পড়ার জন্য নভোখেয়া ছাড়া হয়েছিল, ঐ নভোখেয়াটির সাথে ধূমকেতুর সংঘর্ষের সময় সেই মহাকাশযান থেকে ঐ দৃশ্যের ফটো তোলা হয়। ঐ সংঘর্ষের ফলে যে বস্তুকণা ধূমকেতু থেকে ছুটে বেড়িয়ে আসে, তার বয়স সাড়ে চারশো কোটি বছরেরও বেশী, যখন সৌর জগতের সৃষ্টি হয়েছিল।

ড. কোটস জানালেন এই গবেষনার এটা কেবল শুরু পর্যায়। এরপর কি হতে যাচ্ছে, তা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘‘লা পালমায় অবস্থিত আইজাক নিউটন টেলিস্কোপ থেকে এই ঘটনার ওপর নজর রাখা হবে। তা‘ছাড়া অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থিত একটি বৃটিশ টেলিস্কোপ থেকেও এ নিয়ে পরীক্ষা চালানো হবে। আমরা জানতে চাই এই ধূমকেতুটির আবরণের নীচে কি আছে, কি পদার্থ দিয়ে তা গঠিত?‘‘

তারা আশা করছেন এই ধূমকেতু যে পদার্থ দিয়ে গঠিত হয়েছে, সে সম্পর্কে জানার মাধ্যমে সৌরজগতের সৃষ্টি এবং গ্রহের সৃষ্টি সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের পরিধি বাড়বে।

পৃথিবীর ওপর ধূমকেতুর বিরাট প্রভাব রয়েছে বলে জানালেন ড.কোটস: ‘‘আমাদের এই পৃথিবীর অতীতের দিকে তাকালে আমরা ধূমকেতুর একটা গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা দেখতে পাবো। যেকোনো পানি, সাগরের পানি বা আমাদের শরীরের মধ্যে যে পানি আছে, তার একটা বড় অংশ আসলে বিভিন্ন ধূমকেতু থেকে এসেছে।‘‘

‘‘আমরা জানি সৌর জগত গঠনের প্রথমদিকে ধূমকেতু একটা বড় গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেছিল। পৃথিবীর সাথে তখন অহরহ ধূমকেতুর সংঘর্ষ হতো। নাসার এই অভিযানে কৃত্রিমভাবে সে ধরনের একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সেই প্রক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে।‘‘

ডীপ ইমপ্যাক্টের একজন প্রধান প্রকৌশলী মাইকেল আ‘হের্ন বিজ্ঞান সাময়িকী নিউ সায়েন্টিস্টে বলেছেন তারা এই সংঘর্ষ সম্পর্কে যে সব তথ্য পাচ্ছেন তা বিশ্লেষনের কাজ সম্পূর্ন শেষ হ‘তে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত লাগতে পারে।

দু‘হাজার তিন সালের পহেলা ফেব্রুয়ারী সাতজন নভোচারী সহ নভোখেয়া স্পেস শাটল কলোম্বিয়া ভেঙ্গে পড়ার পর এই প্রথম আরেকটি স্পেস শাটল মহাকাশে যাত্রা করতে যাচ্ছে। বুধবার সাতজন নভোচারী নিয়ে স্পেস শাটল ডিসকভারির যাত্রা শুরু করার কথা।

বিজ্ঞানীরা বলেন বিশ্ব জুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি হচ্ছে পরিবেশের পরির্তনের প্রধান উদাহরন; কার্বন-ডাই-অক্সাইডসহ ক্ষতিকর গ্রীন হাউস গ্যাস বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য দায়ী৻ আর এই গ্রীন হাউস গ্যাস তৈরীর একটা অন্যতম উৎস হচ্ছে বিমান চলাচল, যা দ্রুত বেড়ে চলেছে।

১৯৯০ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত শুধুমাত্র বৃটেনেই বিমান চলাচল থেকে গ্রীন হাউস গ্যাসের নির্গমন ৮৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। আর তাই বিমান চলাচলে বিকল্প জ্বালানী ব্যাবহার নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখন চিন্তা-ভাবনা করছেন।

তবে সবচাইতে আগে নজর দেয়া হচ্ছে প্রচলিত জ্বালানী ব্যাবহার করে এঞ্জিনের দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে, যাতে করে একই দূরত্ব যেতে আগের চাইতে কম জ্বালানী লাগে এবং ফলে যাতে পরিবেশ দূষন কম হয়।

বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে বৃটেনের ক্র্যানফিল্ড স্কুল অব এঞ্জিনিয়ারিং-এর মহাকাশ প্রযুক্তি বিভাগের প্রধান প্রফেসর জ্বন ফিল্ডিংএই দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয় ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘‘বেশ কয়েকভাবে এটা করা যায়। এর মধ্যে রয়েছে বিমানের অবতরণ নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাবস্থা আরো উন্নত করা, যাতে অবতরনের জন্য বিমানকে অযথা বেশ অনেকটা সময় আকাশে ঘুরপাক না খেতে হয়।‘‘

‘‘ তা‘ছাড়া বর্তমানের প্রযুক্তি ব্যবহার করেই বিমানের এঞ্জিনের দক্ষতা আরো বাড়ানো যায়। সেইসাথে বিমানের ওজন কমানোর জন্য নতুন ধরনের উন্নত কাঠামো তৈরী করা হচ্ছে। এর ফলে বিমানের জ্বালানী কমে যাচ্ছে। আর বিমানে কয়েকটন জ্বালানী কম বহন করতে হ‘লে তার ফলে কম জ্বালানীতে বিমান আরো দূরের পথ পাড়ি দিতে পারবে।‘‘

কিন্তু কারিগরি দক্ষতা বাড়ানোর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আর তাই বিজ্ঞানীরা এখন বিমান চালানোর জন্য বিকল্প জ্বালানী নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছেন বলে প্রফেসর ফিল্ডিং জানালেন, ‘‘বেশ কয়েকটা বিকল্প উপায় রয়েছে। ব্রাজিলে সম্প্রতি ছোট আকারের বিমানে জ্বালানী হিসেবে আলকোহল ব্যাবহার করা হয়েছে। আখের রস থেকে তৈরী এই আলকোহল জ্বালানী হিসেবে সফলভাবে কাজ করেছে।‘‘

‘‘ এপিনিমা নামের এই জ্বালানী ব্রাজিলে মোটরগাড়ীতে অনেকদিন ধরে ব্যবহার করা হ‘লেও বিমানে এই প্রথম। বিমানের জ্বালানী হিসেবে কেরোসিনের বিকল্প হিসেবে সবচাইতে বড় গবেষনা হচ্ছে তরল হাইড্রোজ্বেন নিয়ে।‘‘

আর হাইড্রোজ্বেন ব্যবহার করে সম্প্রতি একটি মার্কিন কোম্পানী একটি ছোট আকারের বিমান পরীক্ষা করেছে। বিমানের মধ্যে ট্যাংকে রাখা তরল হাইড্রোজ্বেন বাতাস থেকে অক্সিজ্বেন নিয়ে বিদ্যুত্ তৈরী করে এবং তা দিয়ে বিমানের এঞ্জিন চলে।

তবে এই প্রযুক্তির একটি সমস্যা হচ্ছে এতে জলের বাষ্প তৈরী হয়, যা থেকে পরিবেশ দূষন হয়। প্রফেসর ফিল্ডিং বলছেন এই প্রযুক্তির ভবিষ্যত রয়েছে, তবে বাণিজ্যিকভাবে প্রয়োগ করার আগে এ নিয়ে অনেক গবেষনা করতে হবে।

গত সপ্তাহের প্রশ্ন: গাছপালারও যে জীবন আছে, তা নিয়ে বহুদিন ধরেই আমাদের মধ্যে কোনো সন্দেহ নেই৻ কিন্তু স্মরণ শক্তি? গাছপালার কি স্মরণ শক্তিও আছে?

জবাব: বিজ্ঞান সাময়িকী নিউ সায়েন্টিস্টে বৃটেনের সাসেক্স ইউনিভার্সিটির জীববিদ্যা বিভাগের পিটার স্কট লিখেছেন গাছপালারও একধরনের স্মরণশক্তি আছে তবে তা আমাদের প্রচলিতো স্মরণ শক্তির মতন নয়। আমাদের মতন মস্তিষ্ক বা নিওরন গাছের নেই। গাছের স্মরণশক্তি বোঝা যায় সেগুলোর ভেতরের রাসায়নিক পদার্থের মাধ্যমে।

পিটার স্কট একটি উদাহরন দিয়েছেন: ফ্লই ট্র্যাপ নামের এক ধরনের উদ্ভিদের গায়ে সূক্ষ অনেক তন্তু থাকে, যেগুলো একবার স্পর্শ করলে কিছু হয় না। কিন্তু দশ সেকেন্ডের মধ্যে দ্বিতীয়বার ঐ তন্তু স্পর্শ করলে সেই তন্তু ঐ বস্তু আঁকড়ে ধরে। সুতরাং, এখানে ঐ উদ্ভিদ প্রথম স্পর্শের অভিজ্ঞতা দশ সেকেন্ড মনে রাখতে পারে বলে ধরা যায়।

এছাড়া বড় ধরনের কোনো খড়ার পর অনেক গাছপালা স্বাভাবিকের চাইতে ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। এখানেও এক ধরনের স্মরণশক্তি কাজ করে বলে ধারনা করা হয়।

আগামী সপ্তাহের প্রশ্ন: কম্পিউটারকে কোনো কোনো বিজ্ঞানী কেন আবহাওয়ার সাথে তুলনা করেন? জবাব পাবেন আগামী আসরে৻